কালিমা, নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত নিয়ে ইসলামী জীবন

হজ্বের মাসাইল: পর্ব ১৬- মুজদালিফা ও রমী করা

270
মুজদালিফায় রওয়ানা
যখন দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে যাবে যে, সূর্য অস্ত গিয়েছে, তখন আরাফাত শরীফ হতে মুজদালিফা শরীফের দিকে রওয়ানা হয়ে যাবেন। সারা রাস্তায় জিকির, দুরূদ এবং ‘লাব্বায়িক’ বারবার পড়তে থাকবেন। সারা পথ কান্না করে করে এগিয়ে যাবেন। কাল আরাফাতের ময়দানে আল্লাহর হক ক্ষমা হয়ে গেছে, এখানে (মুজদালিফায়) বান্দার হক ক্ষমা করার ওয়াদা রয়েছে।(বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১৩১, ১১৩৩ পৃষ্ঠা)
মুজদালিফা ও রমী করা 
এই দেখুন! মুজদালিফা শরীফ এসে গেছে! চারিদিকে কিরণ এবং সৌন্দর্য্য লেগে আছে, মুজদালিফার সম্মুখভাগে খুব প্রচন্ড ভিড় হয়। আপনি নির্ভয়ে স্বাভাবিক ভাবে একেবারে সামনের দিকে চলে যান। اِنۡ شَآءَ اللہ عَزَّوَجَلّ ভিতরে প্রশস্ত খোলামেলা জায়গা পেয়ে যাবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে খুব বেশী সতর্ক থাকবেন যে, যেন আবার মীনা শরীফের সীমানায় ঢুকে না যান। যারা পায়ে হেঁটে যাবেন তাদের জন্য আমার পরামর্শ হল; মুজদালিফায় প্রবেশ করার পূর্বেই ইস্তিঞ্জা, অযু ইত্যাদি সেড়ে নিবেন। অন্যথায় ভিড়ে খুব চরম সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন।
মাগরিব ও ইশা এক সাথে পড়ার পদ্ধতি
এখানে আপনাকে একটি আযান এবং একটি ইকামত দ্বারা (মাগরিব ও এশা) উভয় ওয়াক্তের নামায এশার সময় এক সাথে আদায় করতে হবে। সুতরাং আযান ও ইকামতের পর প্রথমে মাগরিবের তিন রাকাত ফরয আদায় করে নিবেন, সালাম ফিরানোর সাথে সাথেই ইশার ফরয পড়ে নিবেন। অতঃপর মাগরিবের সুন্নাত, নফল (আওয়াবীন) সমূহ এরপর ইশারের সুন্নাত, নফল এবং বিতির অন্যান্য নফল নামায আদায় করুন। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১৩২ পৃষ্ঠা)
কংকর সমূহ বেছে নিন
আজকের রাত কোন কোন আকাবের ওলামা رَحِمَہُمُ اللہُ تَعَالٰی এর মতে, লায়লাতুল কদরের চেয়েও উত্তম। এই রাত অমনোযোগীতা এবং খোশগল্পে নষ্ট করা মানে বিরাট কিছু থেকে বঞ্চিত হওয়া। যদি সম্ভব হয় তাহলে সারারাত ‘লাব্বায়িক’ যিকির ও দরূদ শরীফ পাঠে অতিবাহিত করুন। (প্রাগুক্ত, ১১৩৩ পৃষ্ঠা) রাতের মধ্যেই শয়তানদেরকে মারার জন্য পবিত্র জায়গা থেকে ৪৯টি কংকর (খেজুর বিচি পরিমাণ) বেঁচে নিন। বরং কিছু বেশী পাথর নিন। যেন নিশানা ভুল হলে (অর্থাৎ পাথর নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে না পড়লে বা হাত ফসকে নিচে পড়ে গেলে) ইত্যাদি কাজে আসে। এগুলোকে তিনবার ধুয়ে নিন, বড় বড় পাথরকে ভেঙ্গে কংকর তৈরী করবেন না। অপবিত্র স্থান থেকে অথবা মসজিদ থেকে অথবা ‘জামরার’পাশ থেকে কংকর নিবেন না। 
একটি জরুরী সতর্কতা
আজ ফযরের নামায প্রথম ওয়াক্তে (ওয়াক্তের শুরুতে) আদায় করা উত্তম। কিন্তু নামায ঐ সময় আদায় করবেন যখন প্রকৃত ভাবে সুবহে সাদিক হয়ে যায়। সাধারণত মুআল্লিমের লোকেরা খুব তাড়াহুড়া করে থাকে, আর ফযরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই ‘সালাত সালাত’ বলে চিৎকার শুরু করে দেয়। ফলে কিছু হাজী ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্বেই নামায আদায় করে নেয়। আপনারা এমনটি করবেন না। বরং অন্যদেরকে নরম সুরে নেকীর দাওয়াত দিয়ে বুঝিয়ে বলুন যে, এখনও সময় হয়নি। যখন কামানের গোলা১২ নিক্ষেপ হবে। এরপর নামায আদায় করুন।
——————-
১২সুবহে সাদিকের সময় মুজদালিফায় ‘কামানের গোলা’ নিক্ষেপ করা হয়, যাতে হাজী সাহেবানদের ফজরের নামাযের সময় জানা হয়ে যায়।
——————-
মুজদালিফায় অবস্থান
মুজদালিফায় রাত অতিবাহিত করা সুন্নাতে মুআক্কাদা। তবে মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব। মুজদালিফায় অবস্থানের সময় হল সুবহে সাদিক থেকে শুরু করে সূর্যোদয় পর্যন্ত। এর মধ্যবর্তী সময়ের যে কোন এক মুহুর্তের জন্য সেখানে অবস্থান করে তাহলে উকুফ বা অবস্থান হয়ে যাবে। এটা স্পষ্ট যে, যে ব্যক্তি ফযরের নামাযের সময় সেখানে ফযরের নামায আদায় করবে তার উকুফ তথা ‘অবস্থান’ বিশুদ্ধভাবে আদায় হয়ে যাবে। যে ব্যক্তি সুবহে সাদিকের পূর্বেই মুজদালিফা হতে চলে গেল তার ওয়াজিব বাদ পড়ে গেছে। সুতরাং তার উপর ‘দম’ দেয়া ওয়াজিব হবে। হ্যাঁ! তবে মহিলা, রোগী, দূর্বল কিংবা শক্তিহীন ব্যক্তি ভিড়ের কারণে যাদের বাস্তবিকই খুব কষ্ট পাবার সম্ভাবনা আছে, তারা যদি এরকম লোক একান্ত অপারগ হয়ে চলে যায় তাহলে কোন অসুবিধা নেই। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১৩৫ পৃষ্ঠা)
মাশআরুল হারাম পাহাড়ের উপর যদি স্থান পাওয়া না যায়, তাহলে উহার পাদদেশে, আর যদি ইহাও সম্ভব না হয় তাহলে ‘ওয়াদিয়ে মুহাস্‌সির১৩’ব্যতীত যেখানেই জায়গা পান, সেখানেই অবস্থান করা জায়েয নয়, আর আরাফাতে অবস্থানকালীন সময়ের সমস্ত নিয়মাবলী এখানেও অনুসরণ করবেন।অর্থাৎ ‘লাব্বায়িক’ বেশী বেশী পড়বেন এবং যিকির, দরূদ এবং দোআর মধ্যে মশগুল থাকবেন। (প্রাগুক্ত, ১১৩৩ পৃষ্ঠা) اِنۡ شَآءَ اللہ عَزَّوَجَلّ যা প্রার্থনা করবেন উহা পেয়ে যাবেন। কারণ, কাল আরাফাত শরীফে আল্লাহর হক ক্ষমা করা হয়েছে, আর এখানে বান্দার হক ক্ষমা করার ওয়াদা রয়েছে। (বান্দার হক ক্ষমা হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ ১৬নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে)
ফযরের নামাযের পূর্বে কিন্তু সুবহে সাদিক হওয়ার পর কেউ যদি এখান থেকে চলে যায় অথবা সূর্য উদিত হওয়ার পরে এখান থেকে বের হল তাহলে সে খুব মন্দ কাজই করল। কিন্তু এর কারণে তার উপর ‘দম’ ইত্যাদি ওয়াজিব হবে না। (প্রাগুক্ত)
——————-
১৩‘ওয়াদিয়ে মুহাসসির’ এটা মীনা ও মুযদালিফার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, আর এটা ঐ উভয়টির সীমানার বাইরের অংশ। মুযদালিফা হতে মীনা যাওয়ার পথে হাতের বাম পাশে যে পাহাড়টি পড়ে তার চূড়া থেকে শুরু করে ৫৪৫ হাত পর্যন্ত এর সীমানা। এখানে‘আসহাবে ফীল’ (অর্থাৎ হস্তিবাহিনী) এসে অবস্থান করেছিল এবং তাদের উপর
‘আবাবিল পাখির আযাব” নাযিল হয়েছিল। এখানে উকুফ তথা অবস্থান করা জায়িয নেই। এই জায়গা দ্রুত অতিক্রম করা এবং আল্লাহর আযাব থেকে আশ্রয় প্রাথর্না করা চাই।
——————-
মুজদালিফা হতে মীনায় যাওয়ার সময় রাস্তায় পড়ার দোআ
যখন সূর্য উদয় হতে আর দুই রাকাত নামায পড়তে যতটুকু সময় লাগে তৎপরিমাণ সময় অবশিষ্ট থাকে তখনই মীনা শরীফের দিকে রওয়ানা হয়ে যান এবং সারা রাস্তায় ‘লাব্বায়িক’ যিকির এবং দুরূদ শরীফ বারবার পড়তে থাকুন, আর এ দোআ পড়ুন:
اَللّٰھُمَّ اِلَيْكَ اَفَضْتُ وَمِنْ عَذَابِكَ اَشْفَقْتُ وَ اِلَيْكَ رَجَعۡتُ وَمِنْكَ رَهِبْتُ فَاقْبَلْ نُسُكي وَعَظِّمْ اَجْرِي وَارْحَم تَضَرُّعِي وَاقْبَل تَوْبَتِي وَاسْتَجِبْ دُعَآئِي ط 
অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি তোমার প্রতি ফিরে এসেছি এবং তোমার শাস্তির ব্যাপারে ভীত এবং তোমার প্রতি মনোনিবেশ করেছি এবং তোমাকে ভয় করি। তুমি আমার ইবাদত কবুল কর এবং আমার প্রতিদান বাড়িয়ে দাও, আর আমার অক্ষমতার উপর দয়া কর এবং আমার তাওবাকে কবুল কর এবং আমার দোআকে কবুল কর।
মীনা দৃষ্টিগোচর হতেই এই দোআ পড়ুন
মীনা শরীফ দৃষ্টিতে পড়লে (প্রথমে ও শেষে দরূদ শরীফ সহকারে) ঐ দোআই পড়ুন; যা মক্কা শরীফ থেকে আসার সময় মীনা শরীফ দেখে পড়েছিলেন। দোআটি হল এই:
اَللّٰھُمَّ ھٰذِهٖ مِنًی فَامْنُنْ عَلَیَّ بِمَا مَنَنْتَ بِہٖ عَلٰی اَوْلِیَآئِکَ ط
অনুবাদ: হে আল্লাহ! এটা মীনা, আমার উপর ঐ দয়াই কর যা তুমি তোমার আউলিয়াদের (বন্ধুদের) উপর করেছ। 
ইয়া ইলাহী! ফজল কর তুঝ কো মীনা কা ওয়াসিতা,
হাজীয়োঁ কা ওয়াসিতা কুল আউলিয়া কা ওয়াসিতা।
صَلُّوْا عَلَی الۡحَبِیۡب! صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلٰی مُحَمَّد
১০ই জুলহিজ্জার প্রথম কাজ হল রমী করা
মুজদালিফা শরীফ হতে মীনা শরীফে পৌঁছে সোজা জামরাতুল আকাবা অর্থাৎ বড় শয়তানের দিকে চলে যাবেন। আজ শুধুমাত্র এই একটিকেই কংকর মারতে হবে। প্রথমে কাবার দিক জেনে নিন, অতঃপর জামরাহ হতে কমপক্ষে ৫ হাত (অর্থাৎ কমপক্ষে প্রায় আড়াই গজ) দূরে (বেশীর কোন সীমা নির্ধারিত নেই) এভাবে দাঁড়ান যেন মীনা আপনার ডান হাতের দিকে এবং কা’বা শরীফ আপনার বাম হাতের দিকে থাকে, আর মুখ যেন জামরাহ এর দিকে থাকে। সাতটি কংকর আপনার বাম হাতে রাখবেন বরং দুই তিনটি কংকর অতিরিক্ত রাখবেন১৪। এখন ডান হাতের চিমটি কাটার স্থানে শাহাদাত আঙ্গুল এবং বৃদ্ধা আঙ্গুলের অগ্রভাগে নিয়ে ডান হাত এমনভাবে উঠাবেন যেন বগলের শুভ্রতা প্রকাশ পায়, প্রতিবার بِسۡمِ اللہِ، اَللہُ اَکَبَر বলতে বলতে একটি একটি করে সাতটি কংকর এমনভাবে নিক্ষেপ করবেন যেন সমস্ত কংকর জামরাহ পর্যন্ত পৌঁছে, নতুবা কমপক্ষে (জামরাহ) তিন হাতের দুরত্বে গিয়ে পড়ে। প্রথম কংকর নিক্ষেপ করতেই ‘লাব্বায়িক’ পড়া বন্ধ করে দিবেন। যখন সাতটি কংকর নিক্ষেপ পূর্ণ হয়ে যাবে তখন সেখানে আর দাঁড়াবেন না। না সোজা সামনে না ডানে বামে কোথাও, বরং তৎক্ষণাৎ জিকির এবং দোয়া পড়তে পড়তে পিছনে ফিরে আসবেন। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১৯৩ পৃষ্ঠা) (দ্রুত পিছন ফিরে চলে আসাই সুন্নাত। কিন্তু বর্তমানে নতুন স্থাপত্যের কারণে পিছন ফিরে আসা সম্ভব নয়। তাই কংকর নিক্ষেপ করে কিছু দূর সামনে এগিয়ে “ইউটার্ন” এর ব্যবস্থা করতে হবে।)
——————-
১৪আহ! যদি অন্তরে এ নিয়্যত এসে যায় যে, আমার নিজের উপর যে খারাপ আসা আকাঙ্খা (শয়তান) চেপে বশে আছে, তাকে মেরে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হব।
——————-
রমী করার সময় সতর্কতা অবলম্বনের ৫টি মাদানী ফুল
সৌভাগ্যবান হাজী সাহেবান! জামারাতে পাথর নিক্ষেপের সময় বিশেষতঃ দশ তারিখের সকাল বেলায় হাজী সাহেবানদের বিরাট জমায়েত হয়ে থাকে, আর অনেক সময় সেখানে লোকেরা চাপা পড়ে যায়। সগে মদীনা عُفِىَ عَنْهُ (লিখক) ১৪০০ হিজরীতে দশ তারিখের সকাল বেলায় মীনা শরীফে নিজ চোখে এই হৃদয় বিদারক দৃশ্য দেখেছি যে, লাশ সমূহকে উঠিয়ে উঠিয়ে এক সারিতে শোয়ায়ে রাখা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে স্থানকে অনেক প্রশস্থ করা হয়েছে। নিচের অংশ ছাড়াও উপরে আরো ৪ তলা বিল্ডিং তৈরী করা হয়েছে। তাই ভীড় এখন বহুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। নিম্নে কিছু সতর্কতা উপস্থাপন করছি। ﴾১﴿ ১০ তারিখ সকাল বেলা খুব বেশী ভীড় থাকে। দুপুর ৩/৪ টা বাজে ভীড় অনেকাংশে কমে যায়। এখন যদি ইসলামী বোনেরাও সাথে থাকে, তারপরও কোন অসুবিধা নেই। উপর তলা থেকে রমী করলে ভীড় আরো খুব কম পাবেন এবং খোলা বাতাসও মিলবে। ﴾২﴿ রমী করার সময় লাঠি, ছাতা আরো অন্যান্য জিনিসপত্র সাথে নিয়ে যাবেন না। কর্তৃপক্ষের লোকেরা তা কেড়ে নিয়ে রেখে দেয়। পরে তা ফিরে পাওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। হ্যাঁ! ছোট স্কুল ব্যাগ যদি কোমরে বাঁধা অবস্থায় থাকে, তাহলে অনেক সময় তা নিয়ে যেতে দেয়। কিন্তু ১০ তারিখের রমীতে এগুলোও না নিয়ে যেতে পারলে ভাল। কারণ যদি আটকে ফেলে, তবে আপনি সমস্যায় পড়তে পারেন। ১১ ও ১২ তারিখের রমীতে ছোট খাটো জিনিস নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাঁধা তুলনামূলক কম থাকে। ﴾৩﴿ হুইল চেয়ারে করে যারা রমী করবেন তাদের জন্য উপযুক্ত সময় হল তিনো দিন আসরের নামাযের পর। ﴾৪﴿ কংকর নিক্ষেপের সময় যদি কোন জিনিস হাত থেকে পড়ে যায়, অথবা আপনার সেন্ডেল বা জুতা যদি পা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে বলে অনুভব হয়, তাহলে ভীড়ের মধ্যে কখনও ঝুঁকবেন না। ﴾৫﴿ যদি কিছু বন্ধু মিলে রমী তথা কংকর নিক্ষেপ করতে চান, তাহলে পূর্ব থেকেই ফিরে এসে একত্রিত হওয়ার জন্য নিকটবর্তী কোন একটি স্থান নির্ধারণ করে উহার চিহ্ন স্মরণ রাখুন। নতুবা বন্ধুদের থেকে পৃথক হয়ে গেলে পেরেশানীর সীমা থাকবে না। ভিড়ের অন্যান্য সকল স্থানে এই কথাটির খুব বেশী স্মরণ রাখবেন! সগে মদীনা عُفِىَ عَنْهُ (লিখক) এমন এমন বৃদ্ধ হাজী সাহেব সাহেবানদেরকে হারিয়ে যেতে দেখেছি যে, এ অসহায়দের নিজেদের মুয়াল্লিমের নামও জানা থাকে না। অতঃপর তারা পরীক্ষায় পড়ে যায়।
রমী করার ৮টি মাদানী ফুল
নবী করীম صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দুটি ইরশাদ: 
﴾১﴿ আরজ করা হল; রমীয়ে জিমার’এ (তথা কংকর নিক্ষেপে) কী সাওয়াব রয়েছে? তিনি صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করলেন: “তুমি তোমার রব এর নিকট এর সাওয়াব তখনই পাবে, যখন তোমার এর (অর্থাৎ সাওয়াবের) খুব বেশী দরকার পড়বে।”(মু’জাম আউসাত, ৩য় খন্ড, ১৫০ পৃষ্ঠা, হাদীস: ৪১৪৭) 
﴾২﴿ “জামরাতে রমী করা তোমার জন্য কিয়ামতের দিন নূর হবে।” (আত্‌তরগীব ওয়াত্‌তারহীন, ২য় খন্ড, ১৩৪ পৃষ্ঠা, হাদীস: ৩) 
﴾৩﴿ সাতটি কংকরের চেয়ে কম নিক্ষেপ করা জায়েজ নেই। যদি শুধুমাত্র তিনটি কংকর নিক্ষেপ করে অথবা মোটেও নিক্ষেপ না করে তাহলে ‘দম’ ওয়াজিব হবে, আর যদি চারটি কংকর নিক্ষেপ করে তাহলে অবশিষ্ট প্রতিটি কংকরের পরিবর্তে ‘সদকা’ দিতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩য় খন্ড, ৬০৮ পৃষ্ঠা) 
﴾৪﴿ যদি সমস্ত কংকর এক সাথে নিক্ষেপ করেন তাহলে ইহা সাতটি ধরা হবে না বরং একটি কংকর বলে গণ্য করা হবে।(রদ্দুল মুহতার, ৩য় খন্ড, ৬০৭ পৃষ্ঠা) 
﴾৫﴿ কংকর সমূহ মাটি জাতীয় পদার্থ হতে হবে। (যেমন: কংকর, পাথর, চুনা, মাটি) যদি কোন প্রাণীর বিষ্টা নিক্ষেপ করে তাহলে রমী হবে না। (দুররে মুখতার ও রদ্দুল মুহতার, ৩য় খন্ড, ৬০৮ পৃষ্ঠা) 
﴾৬﴿ অনুরূপভাবে কোন কোন লোক ‘জামারাতের’মধ্যে পাত্র, জুতা ইত্যাদি নিক্ষেপ করে, ইহাও সুন্নাত নয়, আর কংকরের পরিবর্তে জুতা অথবা ডিব্বা ইত্যাদি যদি নিক্ষেপ করে তাহলে রমী আদায় হবে না। 
 ﴾৭﴿ রমীর জন্য উত্তম এটাই হল যে, মুজদালিফা হতে কংকরসমূহ নিয়ে যাবেন। তবে ইহা আবশ্যক নয়। দুনিয়ার যে কোন অংশের কংকর সমূহ নিক্ষেপ করুন না কেন রমী সঠিক ভাবে আদায় হয়ে যাবে। 
﴾৮﴿ দশ তারিখের রমী তথা পাথর নিক্ষেপ সূর্য উদয় হতে শুরু করে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া পর্যন্ত (অর্থাৎ যোহরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত) সময়ে করা সুন্নাত, আর সূর্য ঢলে পড়া হতে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত রমী করা মুবাহ (অর্থাৎ জায়েজ), আর সূর্য অস্ত যাওয়া হতে সুবহে সাদিক পর্যন্ত সময়ে রমী করা মাকরূহ। যদি কোন অপরাগতার কারণে হয়, যেমন রাখাল যদি রাতে রমী করে তাহলে মাকরূহ হবে না। (প্রাগুক্ত, ৬১০)
ইসলামী বোনদের রমী
সাধারণত দেখা যায় যে, পুরুষেরা কোন অপারগতা ছাড়াই মহিলাদের পক্ষ হতে রমী আদায় করে দেয়। এভাবে ইসলামী বোনেরা রমীর সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থেকে যায়, আর যেহেতু রমী করা ওয়াজিব, সেহেতু ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়ার কারণে তাদের উপর ‘দম’ ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই ইসলামী বোনেরা নিজের রমী নিজেরাই করবেন।
রোগীদের রমী
কিছু কিছু হাজী সাহেবান এমনি তো সবস্থানে সতস্ফুর্ত ঘুরাঘুরি করে কিন্তু সাধারণ অসুস্থতার কারণে তারা অন্যদের মাধ্যমে রমী করিয়ে নেয়।
অসুস্থ ব্যক্তির পক্ষ থেকে রমী করার পদ্ধতি
সদরুশ শরীয়া, বদরুত তরিকা হযরত আল্লামা মাওলানা মুহাম্মদ আমজাদ আলী আজমী رَحۡمَۃُ اللہِ تَعَالٰی عَلَیْہِ বলেন: যে ব্যক্তি এমন অসুস্থ হয় যে, বাহনের উপর বসেও জামরা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। সে অন্যকে নির্দেশ দিবে যে, তার পক্ষ থেকে যেন রমী করে দেয়। এখন প্রতিনিধির জন্য উচিত যে, যদি সে এখনও পর্যন্ত নিজের রমী না করে থাকে, তাহলে প্রথমে নিজের পক্ষ থেকে সাতটি কংকর নিক্ষেপ করবে, অতঃপর রোগীর পক্ষ থেকে রমী করবে। এখন যদি প্রতিনিধি এমন করে যে, একটি কংকর নিজের পক্ষ থেকে মেরে অপরটি রোগীর পক্ষ থেকে। এভাবে সাতবার করল তবে মাকরূহ হবে। যদি কেউ অসুস্থ ব্যক্তির হুকুম ব্যতীত তার পক্ষ থেকে রমী আদায় করে দেয়, তাহলে রমী আদায় হবে না, আর যদি অসুস্থ ব্যক্তির মধ্যে এতটুকু শক্তি নেই যে, রমী করতে পারবে। তাহলে উত্তম হল যে, তার সাথী তার হাতে কংকর রেখে রমী করিয়ে দিবে। অনুরূপ ভাবে বেহুশ, মাজনুন (অর্থাৎ পাগল) অথবা অবুঝ শিশুর পক্ষ থেকে তার সাথীরা রমী করে দিবে, আর উত্তম হল যে, তাদের হাতে কংকর রেখে রমী করিয়ে দিবে। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১৪৮ পৃষ্ঠা)