কালিমা, নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত নিয়ে ইসলামী জীবন

হজ্বের মাসাইল: পর্ব ১৩- মাথা মুন্ডানো ও তাওয়াফ বিষয়ে জরুরী মাসআলা

394
তাওয়াফে কুদুম বা আগমনী তাওয়াফ
ইফরাদ হজ্বকারীর জন্য এই তাওয়াফ, তাওয়াফে কুদুম অর্থাৎ দরবারে উপস্থিতির অভিবাদন হয়ে গেল। হজ্জ্বে কিরানকারী এর পরে তাওয়াফে কুদুমের নিয়্যতে অতিরিক্ত একটি তাওয়াফও সাঈ করবে। তাওয়াফে কুদুম হজ্জ্বে কিরানকারী এবং হজ্জ্বে ইফরাদকারী উভয়ের জন্য সুন্নাতে মুআক্কাদা। যদি ছেড়ে দেন তাহলে অন্যায় করেছেন, তবে দম ইত্যাদি ওয়াজিব হবে না। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১১১ পৃষ্ঠা)
মাথা মুন্ডানো ও তাওয়াফ 
মাথা মুন্ডানো বা চুলকাটা
এখন পুরুষেরা হলক করবে অর্থাৎ মাথা মুন্ডন করাবে অথবা তাকছীর করবে অর্থাৎ চুল কাটাবে। তবে হলক করে নেয়াটা উত্তম। হুযুর পুরনূর, নবী করীম, রউফুর রহীম صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم হুজ্জাতুল ওয়াদা (বিদায় হজ্ব) এর সময় হলক করিয়েছেন, আর মাথা মুন্ডনকারীদের জন্য তিনবার রহমতের দোআ করেন, আর চুল কর্তনকারীদের জন্য একবার (রহমতের দোআ) করেন।(বুখারী, ১ম খন্ড, ৫৭৪ পৃষ্ঠা, হাদীস: ১৭২৮) 
তাকছীর তথা চুলকাটার সংজ্ঞা
কমপক্ষে মাথার এক চতুর্থাংশের চুল আঙ্গুলের গিরা পরিমাণ কাটা। এখানে এ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে যে, আঙ্গুলের এক গিরার চেয়ে একটু বেশী কাটতে হবে। যাতে মাথার মধ্যখানের ছোট ছোট যে চুল আছে তাও যেন এক গিরা পরিমাণ কাটা হয়। অনেকে কাঁচি দ্বারা মাথার দুই তিন জায়গা থেকে কিছু চুল কেটে নেয়, হানাফী মাযহাবের অনুসারীদের জন্য ইহা সম্পূর্ণ ভুল পদ্ধতি। আর এভাবে ইহরামের নিয়মনীতির বাধ্যবাধকতাও শেষ হবে না। 
ইসলামী বোনদের চুলকাটা
ইসলামী বোনদের জন্য মাথা মুন্ডানো হারাম। তারা শুধুমাত্র চুল কাটবে। ইহার সহজ পদ্ধতি হল, নিজের মাথার ঝুটির চুলকে আঙ্গুলের সাথে মিলিয়ে এক গিরার চেয়ে একটু বেশী কেটে নিবে। কিন্তু এই সতর্কতা অবশ্যই থাকতে হবে যে, কমপক্ষে মাথার এক চতুর্থাংশের চুল এক গিরা সমপরিমাণ পর্যন্ত কাটা যেতে হবে।
লাগাওঁ দিল কো না দুনিয়া মে হার কিছি শায় ছে
তাআল্লুক আপনা হো কা’বা ছে ইয়া মদীনে ছে। (সামানে বখশিশ)
صَلُّوْا عَلَی الۡحَبِیۡب! صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلٰی مُحَمَّد
তাওয়াফে কুদুমকারীদের (মক্কা শরীফে প্রবেশের পর সর্বপ্রথম তাওয়াফ) জন্য নির্দেশনা
তাওয়াফে কুদুমে ইজতিবা রমল এবং সাঈ আবশ্যক নয়। কিন্তু এ তাওয়াফে যদি তা করা না হয় তাহলে এ সকল কাজ তাওয়াফে জেয়ারতে করতে হবে। হতে পারে সে সময় ক্লান্তি ইত্যাদির কারণে কষ্ট হতে পারে, ভারী মনে হতে পারে। তাই আমি এগুলোকে সাধারণভাবে নিয়মের অন্তর্ভূক্ত করে দিয়েছি। যাতে তাওয়াফে জিয়ারতে সেগুলোর আর প্রয়োজন না হয়।
তামাত্‌তু কারীদের জন্য নির্দেশনা
ইফরাদ হজ্বকারী ও কিরান হজ্বকারীতো হজ্বের রমল ও সাঈ থেকে তাওয়াফে কুদুমেই তা আদায় করার মাধ্যমে অবকাশ পেয়ে গেল। কিন্তু তামাত্তুকারী যে তাওয়াফ এবং সাঈ করেছে উহা ওমরার জন্য এবং তার জন্য তাওয়াফে কুদুম সুন্নাত নয়, যাতে করে সে এ তাওয়াফের মধ্যে এগুলো আদায় করে দায়মুক্ত হয়ে যাবে। তাই যদি তামাত্তুকারীও যদি হজ্বের প্রথমেই এ কাজগুলো আদায় করে কিছুটা অবকাশ নিতে চায় তাহলে যখন সে হজ্বের ইহরাম বাঁধবে তখনই একটি নফল তাওয়াফ আদায়ের মাধ্যমে তাতে রমল ও সাঈ করে নিবে। তখন তার জন্যও তাওয়াফে জেয়ারতে রমল ও সাঈর প্রয়োজন হবে না। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১১২ পৃষ্ঠা) ৬ অথবা ৭ অথবা ৮ই জুলহিজ্জায় যদি আপনি হজ্বের ইহরাম বাঁধেন, তাহলে সাধারণত এ সময়ে প্রচন্ড ভিড় হয়। তাই চাইলেও হজ্বের রমল ও সাঈ এর জন্য এখন নফল তাওয়াফের নিয়্যত করবেন না। তাওয়াফে জেয়ারতেই (এ সমস্ত কাজ) করে নিবেন। অন্যথায় ইহরামও হবে না, আর আশা করা হচ্ছে ভিড়ও কম পাবেন। ১০ তারিখে পুনরায় খুব ভিড় হয়। অবশ্য ১১ ও ১২ তারিখ ভিড়ের মাত্রা যথেষ্ট পরিমাণে কম হতে থাকে।
সমস্ত হাজীদের জন্য মাদানী ফুল
এখন সমস্ত হাজীগণ চাই কিরানকারী হোক কিংবা তামাত্তুকারী হোক কিংবা ইফরাদকারী সকলেই মীনা যাওয়ার উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফে ৮ই জিলহজ্জের অপেক্ষায় নিজের জীবনের সুন্দর সময়গুলো অতিবাহিত করবে। 
আশিকানে রাসুল! ইহা ঐ সম্মানিত গলিসমূহ যেখানে আমাদের প্রিয় আক্বা মাদানী মুস্তফা صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم নিজের পবিত্র জীবনের কম-বেশী ৫৩ বৎসর অতিবাহিত করেছেন। এখানকার প্রতিটি স্থানে মাহবুবে আকরাম صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর স্মৃতিময় কদমে পাকের ছোঁয়া রয়েছে। তাই এই সম্মানিত গলি সমূহের আদব করুন। সাবধান এখানে গুনাহতো দূরের কথা গুনাহের কল্পনাও যেন না আসে। কেননা এখানকার এক নেকী যেমন লাখের সমান, তেমনি এক গুনাহও লক্ষ গুনাহের সমান। গালি গালাজ, গীবত, চোগলখোরী, মিথ্যা, কু-দৃষ্টি, খারাপ ধারণা ইত্যাদি সর্বাবস্থায় হারাম। কিন্তু এখানকার গুনাহতো লক্ষগুণ বেশী, আর কখনও এমন বোকামী করে গুনাহের দুঃসাহস দেখাবেন না যে, মাথা মুন্ডানোর সাথে সাথে (আল্লাহ তাআলা হেফাজত করুন) দাঁড়িও মুন্ডায়ে ফেলবেন। সাবধান! দাঁড়ি মুন্ডানো অথবা দাঁড়ি কেটে একমুষ্টির চেয়ে ছোট করে ফেলা উভয়টি সমপর্যায়ের হারাম এবং জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার মত কাজ। এখানে তো একবার দাঁড়ি মুন্ডালে কিংবা একবার দাঁড়ি কেটে এক মুষ্টির চেয়ে ছোট করলে লক্ষবার হারামের গুনাহ হবে। বরং হে খোশ নছীব আশেকানে রাসুল! এখনতো আপনাদের চেহারাকে মক্কা মদীনার হাওয়া চুমু দিচ্ছে। 
তাই এই মোবারক চুল (দাঁড়ি) সমূহকে বাড়তে দিন, আর এতদিন পর্যন্ত যতবার দাঁড়ি মুন্ডিয়েছেন অথবা ছেটে এক মুষ্টি থেকে কম করে নিয়েছেন, এর জন্য তাওবা করে নিন এবং সব সময়ের জন্য প্রিয় আক্বা صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর পবিত্র সুন্নাত দাঁড়ি মোবারককে নিজের চেহারায় সাজিয়ে নিন। 
ছরকার কা আশিক ভি কিয়া দাঁড়ি মুন্ডাতা হে?
কিউ ইশক কা চেহরা ছে ইজহার নেহী হুতা।
(ওয়াসায়িলে বখশিশ, ২৩৪ পৃষ্ঠা)
صَلُّوْا عَلَی الۡحَبِیۡب! صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلٰی مُحَمَّد
যতক্ষণ মক্কা শরীফে থাকবেন কি করবেন?
﴾১﴿ বেশী বেশী নফল তাওয়াফ করবেন। ইহা মনে রাখবেন যে, নফল তাওয়াফের মধ্যে তাওয়াফের পরে সর্বপ্রথম মুলতাজিমকে জড়িয়ে ধরতে হয়, অতঃপর মকামে ইবরাহীমে দুই রাকাত নফল নামায পড়তে হয়। 
﴾২﴿ কখনো হুজুর আকরাম صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর নামে তাওয়াফ করুন, কখনো গাউছুল আজম رَحۡمَۃُ اللہِ تَعَالٰی عَلَیْہِ এর নামে, কখনো নিজের পীর ও মুর্শিদের নামে, কখনো নিজের মা-বাবার নামে তাওয়াফ করুন। 
﴾৩﴿ বেশী বেশী নফল রোজা রেখে প্রতি রোজায় লক্ষ লক্ষ রোজার সাওয়াব লাভ করুন। তবে এই সতর্কতা অবলম্বন করুন যে, যদি আপনি মসজিদে হারামে (অথবা যে কোন মসজিদে) রোজার ইফতারের উদ্দেশ্যে খেজুর ইত্যাদি জমজমের পানি পান করেন, তখন ইতিকাফের নিয়্যত করা আবশ্যক। 
﴾৪﴿ যতবার কা’বা শরীফের উপর দৃষ্টি পড়বে, সাথে সাথে তিনবার لَآاِلٰہَ اِلَّااللہُ وَاللہُ اَکْبَرُ বলবেন এবং দুরূদ শরীফ পড়ে দোআ করবেন।اِنۡ شَآءَ اللہ عَزَّوَجَلّ দোআ কবুল হবে। 
﴾৫﴿ যার পায়ে হেঁটে হজ্ব করার নিয়্যত রয়েছে, তিনি যেন ২/৪ দিন পূর্বে মীনা শরীফ, মুজদালিফা শরীফ এবং আরাফাত শরীফে উপস্থিত হয়ে নিজের তাবু দেখে আসে এবং তাতে (চেনার উপায় হিসেবে) কোন নিশানা লাগিয়ে আসে। এমনকি যাতায়াতের জন্য রাস্তাকে নির্বাচন করুন, যা আপনাকে খুব সহজে এ তাবুতে পৌঁছিয়ে দিবে। নতুবা ভিড়ে কঠিন সমস্যা হতে পারে। 
(ইসলামী বোনদের জন্য বাসে করে যাওযার মধ্যে নিরাপত্তা)। পায়ে হাটাতে ইসলামী ভাইদের সাথে সংযুক্ত এবং বিক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এমনকি মুজদালিফায় প্রবেশের সময় লাখো মানুষের ভিড়ে ইসলামী বোনদেরকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। (আল আমান ওয়াল হাফিজ) ﴾৬﴿ কেনাকাটার মধ্যে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার পরিবর্তে ইবাদতের মধ্যে সময় অতিবাহিত করার চেষ্টা করুন। এই সোনালী সুযোগ বারবার হাতে আসেনা।
صَلُّوْا عَلَی الۡحَبِیۡب! صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلٰی مُحَمَّد
জুতার ব্যাপারে জরুরী মাসআলা
কিছু লোক মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববী عَلٰی صَاحِبِہَا الصَّلٰوۃُ وَالسَّلَام এর দরজা মোবারকের বাহিরে জুতা রেখে দেয়। অতঃপর ফিরে যাওয়ার সময় যে জুতাই পছন্দ হয়, তা পরিধান করে চলে যায়। এধরণের জুতা অথবা চপ্পল আপনি শরয়ী অনুমতি ছাড়া যতবার ব্যবহার করেছেন, ততবার আপনার গুনাহ হতেই থাকবে। যেমন: আপনি শরীয়াতের অনুমতি ছাড়া এক বার তুলে আনা জুতা ১০০ বার পরিধান করলেন, তাহলে আপনার ১০০ বার পরিধান করার গুনাহ হবে। এই জুতাগুলোর হুকুম হবে লুকতা (অর্থাৎ কারো পড়ে যাওয়া জিনিস) এর হুকুমের মত। যদি এর মালিক পাওয়া না যায়, তবে যে ব্যক্তি এ লুকতা পেয়েছে যদি সে নিজে অভাবী হয় তবে নিজে রাখতে পারবে। নতুবা কোন অভাবী মানুষকে দিয়ে দিবে। 
যে ব্যক্তি অন্য কারো জুতা অবৈধ পন্থায় ব্যবহার করে ফেলেছে তিনি এখন কী করবেন?
উপরোল্লেখিত পন্থায় পৃথিবীতে যে ব্যক্তি যে কোন স্থানে থেকে এই ধরনের কাজ করে ফেলেছেন সে গুনাহগার হবে। নিজের জন্য এই ধরনের “লুকতা” (অর্থাৎ পড়ে যাওয়া বস্তু) কুড়িয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের উপর ফরয (আবশ্যক) হচ্ছে, তাওবাও করবে এবং এধরনের যতগুলো জুতা, চপ্পল নিয়েছে যদি ঐ গুলোর প্রকৃত মালিক বেঁচে থাকে তাহলে তাদের নিকট নতুবা তাদের ওয়ারিশদের নিকট তা ফিরিয়ে দেয়া। যদি তাদের নিকট পৌছানো সম্ভব না হয় তাহলে ঐ সকল বস্তুগুলো অথবা যদি ঐ সকল বস্তুই অবশিষ্ট না থাকে (অর্থাৎ বিনষ্ট হয়ে যায় বা আপনার মালিকানায় না থাকে) তবে তার সমপরিমাণ মূল্য কোন শরয়ী মিসকিন কে (সাওয়াবের নিয়্যত ছাড়া) দিয়ে দিবে। অথবা তার মূল্য মসজিদ ও মাদরাসা ইত্যাদিতে দিয়ে দিবে। (লুকতার বিস্তারিত মাসআলা জানার জন্য বাহারে শরীয়াত ২য় খন্ডের পৃষ্ঠা নং ৪৭১-৪৮৪ পর্যন্ত অধ্যয়ন করুন।)
আহ! জো বু চুকা হো ওয়াক্তে দিরাও
হোগা হাসরত কা সামনা ইয়া রব! (যওকে না’ত)
صَلُّوْا عَلَی الۡحَبِیۡب! صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلٰی مُحَمَّد
ইসলামী বোনদের জন্য মাদানী ফুল
মহিলারা নামায তাদের বিশ্রামস্থলেই (আবাসস্থলেই) পড়বে। নামায পড়ার জন্য যে সকল ইসলামী বোনেরা মসজিদাঈনে করীমাঈনে (অর্থাৎ মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে) উপস্থিত হয়, এটা তাদের মুর্খতা, (অজ্ঞতার কারণেই করে থাকে)। কেননা মূলত উদ্দেশ্য হচ্ছে সাওয়াব অর্জন করা, আর আমাদের প্রিয় ছরকার, মাদানী তাজেদার صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلَیْہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর ইরশাদ হচ্ছে: “মহিলাদের আমার মসজিদে (অর্থাৎ মসজিদে নববী عَلٰی صَاحِبِہَا الصَّلٰوۃُ وَالسَّلَام এ নামায পড়ার চেয়ে বেশী সাওয়াব হচ্ছে ঘরে নামায আদায় করা।”(বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১১২ পৃষ্ঠা। মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ১০ম খন্ড, ৩১০ পৃষ্ঠা, হাদীস নং: ২৭১৫৮)
তাওয়াফের মধ্যে ৭টি কাজ হারাম
তাওয়াফ যদিওবা নফল হয়, তাতে ৭টি কাজ হারাম:
﴾১﴿ অজু ছাড়া তাওয়াফ করা। 
﴾২﴿ একান্ত অপারগতা ব্যতীত পালকীতে আরোহন করে অথবা কোলে চড়ে অথবা কারো কাঁধে আরোহন করে ইত্যাদি নিয়মে তাওয়াফ করা। 
﴾৩﴿ কোন অপারগতা ছাড়া বসে বসে সরে যাওয়া (পার্শ্বপরিবর্তন করা) অথবা হামাগুড়ি দিয়ে চলা।
﴾ ৪﴿ কা’বাকে হাতের ডান দিকে রেখে উল্টা তাওয়াফ করা। 
﴾৫﴿ তাওয়াফে ‘হাতিমের’ ভিতর দিয়ে চলা। 
﴾৬﴿ সাত চক্করের কম তাওয়াফ করা। 
﴾৭﴿ যে অঙ্গ সতরের অন্তর্ভূক্ত, উহার এক চতুর্থাংশ খোলা (অনাবৃত) রাখা। যেমন: রান (উরু), কান অথবা হাতের কব্জি ও কুনুই এর মধ্যাংশ।(বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১১২ পৃষ্ঠা) ইসলামী বোনেরা এ ব্যাপারে খুব বেশী সতর্ক থাকুন যে, তাওয়াফের সময় বিশেষতঃ হাজরে আসওয়াদে ইসতিলাম দেওয়ার সময় অনেক ইসলামী বোনের হাতের কব্জির এক চতুর্থাংশ তো নয় বরং অনেক সময় সম্পূর্ণ হাতের কব্জিই (কব্জি থেকে কুনুই এর মধ্যাংশ) উন্মুক্ত হয়ে যায়। (তাওয়াফ ব্যতীত অন্যান্য সময়ও গাইরে মাহরামের সামনে মাথার চুল বা কান বা কব্জি খোলা (উন্মুক্ত করা) হারাম। পর্দার বিস্তারিত বিধান জানার জন্য দা’ওয়াতে ইসলামীর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মাকতাবাতুল মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত ৩৯৭ পৃষ্ঠা সম্বলিত কিতাব “পর্দা সম্পির্কিত প্রশ্নোত্তর” খুব ভালো করে অধ্যয়ন করুন।
তাওয়াফের এগারটি মাকরূহ
﴾১﴿ অনর্থক কথাবার্তা বলা। 
﴾২﴿ জিকির, দোআ বা তিলাওয়াত বা না’ত, মুনাজাত অথবা যে কোন শরয়ী কালাম (যেমন: শের-আশআর বা যে কোন ধরনের বৈধ কাথাবার্তা) ইত্যাদি উচ্চ আওয়াজে করা। 
﴾৩﴿ হামদ ও সালাত (আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুলে পাকের উপর দরূদ ও সালাম) ব্যতীত অন্য কোন শের পড়া। 
﴾৪﴿ অপবিত্র কাপড়ে তাওয়াফ করা। (সতর্কতা হচ্ছে, ব্যবহারের সেন্ডেল অথবা জুতা সাথে নিয়ে তাওয়াফ না করা।) 
﴾৫﴿ রমল (চক্কর) অথবা 
﴾৬﴿ ইজতিবা (ডান কাঁধ উন্মুক্ত রাখা) অথবা 
﴾৭﴿ হাজরে আসওয়াদকে চুমু দেয়া ইত্যাদি কাজের যেখানে যেখানে করার হুকুম রয়েছে তা না করা। ﴾৮﴿ তাওয়াফের চক্কর সমূহের মধ্যে বেশী ব্যবধান করা। (অর্থাৎ এক চক্কর ও অন্য চক্করের মাঝখানে বেশী সময়ের দূরত্ব সৃষ্টি করা) ইস্তিঞ্জার জন্য যেতে পারেন। অযু করে বাক্বী গুলো সম্পূর্ণ করে নিবেন। 
﴾৯﴿ এক তাওয়াফ শেষ করার পর উহার দুই রাকাত নামায না পড়ে দ্বিতীয় তাওয়াফ শুরু করে দেয়া। তবে যদি মাকরূহ ওয়াক্ত চলে আসে, তাহলে অসুবিধা নেই। যেমন: সুবহে সাদিক হতে সূর্য উদয় পর্যন্ত, অথবা আসরের নামাযের পর হতে সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত এই সময়ে করা অনেক তাওয়াফ ‘তাওয়াফের নামায’ ব্যতীত জায়েজ হবে। তবে মাকরূহ সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্রতি তাওয়াফের জন্য দুই দুই রাকাআত নামায আদায় করে দিতে হবে। 
﴾১০﴿ তাওয়াফের সময় কোন কিছু খাওয়া। 
﴾১১﴿ প্রস্রাব কিংবা বায়ু ইত্যাদি প্রচন্ড বেগ নিয়ে তাওয়াফ করা।(বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১১৩ পৃষ্ঠা। আল মাসলাকুল মুতাকাস্যিত লিল কারী, ১৬৫ পৃষ্ঠা)
তাওয়াফ এবং সাঈতে এ সাতটি কাজ জায়েজ
﴾১﴿ সালাম করা। 
﴾২﴿ সালামের জবাব দেওয়া। 
﴾৩﴿ প্রয়োজনের সময় কথা বলা। 
﴾৪﴿ পানি পান করা। (সাঈর সময় খেতেও পারবেন) 
﴾৫﴿ হামদ, না’ত অথবা মানকাবাতের (স্মৃতিচারণ মূলক জীবনী) পংক্তি সমূহ আস্তে আস্তে পড়া। 
﴾৬﴿ তাওয়াফকালীন সময়ে নামাজীর সামনে দিয়ে পথ চলা জায়েজ। কারণ তাওয়াফও নামাযের মত। কিন্তু সাঈর সময় নামাযীর সামনে দিয়ে যাওয়া জায়েজ নয়। 
﴾৭﴿ ধর্মীয় মাসআলা জিজ্ঞাসা করা অথবা তার জবাব দেয়া। (প্রাগুক্ত, ১১১৪ পৃষ্ঠা। আল মাসলাকুল মুতাকাস্যিত, ১৬২ পৃষ্ঠা)
সাঈর ১০টি মাকরূহ
﴾১﴿ প্রয়োজন ছাড়া সাঈর চক্করসমূহের মধ্যে বেশী ব্যবধান করা (অর্থাৎ এক চক্করের মাঝখানে লম্বা দূরত্ব সৃষ্টি করা)। হ্যাঁ! তবে হাজত সারার (প্রস্রাব পায়খানার প্রয়োজনে) জন্য যেতে পারে। অথবা অযু নবায়ণ করার জন্যও যেতে পারে। (সাঈতে অযু আবশ্যক নয় বরং মুস্তাহাব) 
 ﴾২﴿ কেনাকাটা করা। 
﴾৩﴿ কোন কিছু বিক্রয় করা। 
﴾৪﴿ অনর্থক কথাবার্তা বলা। 
﴾৫﴿ অনর্থক এদিক সেদিক তাকানো, সাঈর মধ্যেও মাকরূহ এবং তাওয়াফের মধ্যে আরো অধিক মাকরূহ। 
﴾৬﴿ সাফা অথবা 
﴾৭﴿ মারওয়ায় আরোহণ না করা। (অল্প কিছু দূর উঠুন, একেবারে চূড়ায় নয়।) 
﴾৮﴿ অপারগতা ব্যতীত কোন পুরুষ ‘মাসআর’ মধ্যে (সাঈর স্থলে) না দৌঁড়ানো। 
﴾৯﴿ তাওয়াফের পর অনেক বিলম্বে সাঈ করা। 
﴾১০﴿ লজ্জাস্থান (পরিপূর্ণ) না ঢাকা। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১১৫ পৃষ্ঠা)
সাঈর চারটি পৃথক মাদানী ফুল
﴾১﴿ সাঈর মধ্যে পায়ে হাঁটা ওয়াজিব, যখন কোন অপারগতা না থাকে ঐ অবস্থায়। (কোন অপারগতা ছাড়া বাহনে চড়ে অথবা হেঁচড়িয়ে হেঁচড়িয়ে সাঈ করলে ‘দম’ ওয়াজিব হবে) (লুবাবুল মানাসিক, ১৭৮ পৃষ্ঠা) 
﴾২﴿ সাঈর জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়। বরং হায়েজ ও নেফাস চলাকালীন সময়েও মহিলারা সাঈ করতে পারবে। (আলমগীরী, ১ম খন্ড, ২২৭ পৃষ্ঠা) 
﴾৩﴿ শরীর ও পোষাক পবিত্র হওয়া এবং ওযু অবস্থা হওয়া মুস্তাহাব। (বাহারে শরীয়াত, ১ম খন্ড, ১১১০ পৃষ্ঠা) 
﴾৪﴿ সাঈ শুরু করার সময় প্রথমে ছাফার দোআ পড়বেন, অতঃপর সাঈর নিয়্যত করবেন। সাঈর অনেক কাজ রয়েছে। যেমন: হাজরে আসওয়াদের ইসতিলাম। ছাফা পর্বতে আরোহণ, দোআ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সকল কাজের শুরুতে ভাল ভাল নিয়্যত করে নিলে, খুব উত্তম হয়। কমপক্ষে অন্তরে এতটুকু নিয়্যত হওয়া যথেষ্ট যে, সাওয়াব অর্জনের জন্য মূল সাঈর পূর্বের কাজগুলো করছি।
ইসলামী বোনদের জন্য বিশেষ তাকিদ
ইসলামী বোনেরা এখানেও এবং প্রত্যেক জায়গায় পুরুষদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকবেন। অধিকাংশ মূর্খ মহিলারা হাজরে আসওয়াদ এবং রুকনে ইয়ামানীকে চুমা দেওয়ার জন্য অথবা আল্লাহর কা’বা শরীফের নিকটবর্তী হওয়ার জন্য বিনা দ্বিধায় পুরুষদের (ভিড়ের) মধ্যে মিশে একাকার হয়ে যায়। তাওবা! তাওবা! ইহা খুব ঔদ্ধত্য পূর্ণ আচরণ এবং নির্লজ্জের কথা। ইসলামী বোনদের জন্য ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় যেমন দিনের ১০টা বাজে তাওয়াফ করা খুবই যথার্থও উপযুক্ত। কেননা ঐ সময় ভীড় খুব কম থাকে।
বৃষ্টি এবং মীজাবে রহমত
বৃষ্টির সময় হাতীম শরীফের মাঝে চারপাশে প্রচন্ড ভিড় হয়ে যায়। মীজাবে রহমত থেকে গড়িয়ে পড়া মোবারক পানি নেওয়ার জন্য হাজী সাহেবগণ পাগলের ন্যায় লাফিয়ে পড়ে। এই মুহুর্তে আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার বরং চাপা খেয়ে মৃত্যু বরণ করার পর্যন্ত ঝুঁকি থাকে। এমন স্থানে ইসলামী বোনদের দূরে থাকা জরুরী। 
হে তাওয়াফে খানায়ে কা’বা সাআদাত মারহাবা!
খুব বারাসতা হে ইয়াহা পর আবরে রহমত মারহাবা!
صَلُّوْا عَلَی الۡحَبِیۡب! صَلَّى اللہُ تَعَالٰی عَلٰی مُحَمَّد