কালিমা, নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত নিয়ে ইসলামী জীবন

কুরবানীর চামড়া সংগ্রহকারীর জন্য ২২ টি নিয়্যত এবং সতর্কতা

380
নবী করীম صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْہِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم এর দু’টি বাণী:
(১) “মুসলমানের নিয়্যত তার আমল থেকে উত্তম।”(মুজাম কবীর, ৬ষ্ঠ খন্ড, ১৮৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ৫৯৪২)
(২) “ভাল নিয়্যত বান্দাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়।”(আল ফিরদাউছ বিমাছুরিল খাত্তাব, ৪র্থ খন্ড, ৩০৫ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ৬৮৯৫)
কুরবানীর চামড়া সংগ্রহ

দু’টি মাদানী ফুল: 

 ভাল নিয়্যত ছাড়া কোন ভাল কাজের সাওয়াব অর্জিত হয়না।
 ভাল নিয়্যত যত বেশি, সাওয়াবও তত বেশি।
(১) আল্লাহ্ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ভাল ভাল নিয়্যত করছি 
(২) প্রতিটি মূহুর্তে শরীয়াত ও সুন্নাতের দামন আকঁড়ে ধরবো
(৩) কুরবানীর চামড়া সংগ্রহ করে দা‘ওয়াতে ইসলামীকে সহযোগীতা করবো 
(৪) লোকেরা যতই খারাপ আচরণ করুক, রাগান্বিত হওয়া এবং 
(৫) দুশ্চরিত্র থেকে বিরত থেকে দা‘ওয়াতে ইসলামীর মান সম্মান রক্ষা করবো 
(৬) কুরবানীর চামড়া সংগ্রহের জন্য যতই ব্যস্ততা থাকুক শরয়ী ওজর ছাড়া কোন নামাযের জামাআত তো দুরের কথা তাকবীরে ঊলাও ছাড়বো না 
(৭) পবিত্র পোষাক ইমামা শরীফসহ তেহবন্দ শপিং ব্যাগ ইত্যাদিতে নিয়ে নামাযের জন্য সাথে রাখবো। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা; জবেহের সময় নির্গত রক্ত নাজাসাতে গলিজা (বড় নাপাকী) এবং প্রস্রাবের মত অপবিত্র আর চামড়া সংগ্রহকারীর জন্য নিজের কাপড় পবিত্র রাখা খুবই কঠিন। ‘বাহারে শরীয়াত’ ১ম খন্ডের ৩৮৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে: ‘নাজাসাতে গলিজার হুকুম হচ্ছে, যদি কাপড়ে বা শরীরে এক দিরহামের চেয়ে বেশি লাগে, তবে তা পবিত্র করা ফরয। তা পবিত্র না করে কোন নামায আদায় করলে তা হবেনা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আদায় করা গুনাহের কাজ। আর যদি শরীয়াতের এই হুকুমকে হালকা মনে করে নামায পড়ে, তবে তা কুফরী হবে। আর যদি দিরহামের সমপরিমাণ হয়, তবে তা পবিত্র করা ওয়াজিব। তা পবিত্র না করে নামায আদায় করা মাকরূহে তাহরীমী। অর্থাৎ এমন নামায পূনরায় আদায় করা ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে আদায় করলে গুনাহগার হবে। আর যদি নাপাকী দিরহাম থেকে কম হয়, তবে পবিত্র করা সুন্নাত। আর তা পবিত্র না করে নামায আদায় করা সুন্নাতের বিপরীত। এই নামায পূনরায় আদায় করে দেয়া উত্তম। 
(৮) মসজিদ, ঘর, মাকতাব (অফিস), মাদরাসা ইত্যাদির ফ্লোরকে, চাটাই, কার্পেট ও অন্যান্য জিনিসসমূহকে রক্তাক্ত হওয়া থেকে বাচাঁবো (ওযুখানার ভিজা ফ্লোর বা পা রাখার জায়গা ইত্যাদির উপর রক্তাক্ত পা নিয়ে যাওয়া থেকে বেঁচে থাকা এবং ওযু করতে গিয়ে খুব সর্তকতা অবলম্বনের প্রয়োজন। নতুবা অপবিত্রতার ময়লা এবং অপবিত্র পানির ছিটা, নিজেকে এবং অন্যান্যদেরকেও অপবিত্র করার সম্ভাবনা থাকে) 
(৯) রক্তাক্ত দূর্গন্ধময় কাপড় নিয়ে মসজিদে যাবোনা (দূর্গন্ধ না হলেও অপবিত্র শরীর বা কাপড় নিয়ে মসজিদে যাওয়া নিষেধ। আঘাত, পোঁড়া, কাপড়, পাগড়ী, চাদর, শরীর বা হাত, মুখ ইত্যাদি থেকেও দূর্গন্ধ আসলে তখনো মসজিদে প্রবেশ করা হারাম। ‘ফয়যানে সুন্নাত’১ম খন্ডের ১২১৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে: ‘মসজিদকে দূর্গন্ধ থেকে রক্ষা করা ওয়াজিব। এজন্য মসজিদে কেরোসিন তেল জ্বালানো হারাম। মসজিদে দিয়াশলাই জ্বালানো হারাম।’ এমনকি হাদীসে পাকে বর্ণিত আছে: ‘মসজিদে কাঁচা মাংস নিয়ে যাওয়া জায়িজ নেই।’ (ইবনে মাজাহ, ১ম খন্ড, ৪১৩ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ৭৪৮) অথচ কাঁচা মাংসের দূর্গন্ধ অনেকটা হালকা হয়ে থাকে।
(১০) কলম, রসিদ বই, প্যাড, গ্লাস, চায়ের কাপ ইত্যাদি পবিত্র জিনিসে অপবিত্র রক্ত লাগতে দিব না। ফতোওয়ায়ে রযবীয়া, ৪র্থ খন্ড, ৫৮৫ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে: পবিত্র জিনিসকে (শরীয়াতের অনুমতি ছাড়া) অপবিত্র করা হারাম। 
(১১) যে (ব্যক্তি) অন্য প্রতিষ্ঠানকে চামড়া দেওয়ার ওয়াদা করেছে, তাকে কুপরামর্শ দিব না। সহজ পদ্ধতি হল; ভাল ভাল নিয়্যত সহকারে আপনি সারা বছর তার প্রতি মনোযোগ দিন এবং নিজে প্রথমে গিয়ে চামড়া বুকিং করে রাখুন।
(১২) নিজেদের নির্ধারিত চামড়া কোন সুন্নী প্রতিষ্ঠানের লোক যদি নেওয়ার জন্য না আসে বা (১৩) ভুলে নিজের কাছে চলে আসে তবে সাওয়াবের নিয়্যতে ঐ প্রতিষ্ঠানে দিয়ে আসবো। 
(১৪) যে চামড়া দিবে তাকে সম্ভব হলে মাকতাবাতুল মদীনার কোন রিসালা বা লিফলেট তোহ্ফা হিসেবে পেশ করবো। 
(১৫) এমনকি তাকে جَزَاكَ اللهُ বলবো। প্রিয় নবী صَلَّی اللّٰہُ  تَعَالٰی عَلَیْہِ  وَاٰلِہٖ وَسَلَّم ইরশাদ করেন: “যে মানুষের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলনা, তবে সে আল্লাহ্ তাআলারও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলনা।” (তিরমিযী শরীফ, ৩য় খন্ড, ৩৮৪ পৃষ্ঠা, হাদীস নং- ১৯৬২) 
(১৬) চামড়া দাতার উপর ইনফিরাদি কৌশিশ করে তাকে সুন্নাতে ভরা ইজতিমা এবং 
(১৭) মাদানী কাফিলায় সফর ইত্যাদির দাওয়াত পেশ করবো। 
(১৮) পরবর্তীতেও তার সাথে যোগাযোগ রেখে চামড়া দেওয়ার ইহসানের বদলা হিসেবে তাকে মাদানী পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করবো যদি 
(১৯) সে মাদানী পরিবেশের সাথে আগে থেকে সম্পৃক্ত থাকে তাহলে তাকে মাদানী কাফিলার মুসাফির বা 
(২০) মাদানী ইন‘আমাতের আমলকারী বানাবো। 
(২১) কোন না কোন আরো মাদানী কাজের ব্যবস্থা করবো। (জিম্মাদারদের উচিত, পরবর্তীতে সময় বের করে চামড়া দাতাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য যাওয়া, এমনকি ঐসব দাতাদেরকে এলাকায় বা যেভাবে সম্ভব হয় একত্রিত করে সংক্ষিপ্ত নেকীর দাওয়াত এবং লঙ্গরে রাসাঈল এর ব্যবস্থা করবো। লঙ্গরে রাসাঈলের জন্য দা‘ওয়াতে ইসলামীর চাঁদা থেকে নয় বরং আলাদা ভাবে ব্যবস্থা করতে হবে।) 
(২২) কাছে বা দূরে যেখানেই চামড়া সংগ্রহের জন্য (অথবা বস্তা বা যেকোন মাদানী কাজ করার জন্য) জিম্মাদার ইসলামী ভাই নির্দেশ দেয় তার নির্দ্বিধায় আনুগত্য করবো। (এইসব নিয়্যত সংখ্যায় অনেক কম, নিয়্যত সম্পর্কিত জ্ঞানী ব্যক্তি আরো অনেক নিয়্যত বের করে নিতে পারেন।)

একটি গুরুত্বপূর্ণ শরীয়াতের মাসয়ালা

সর্বদা কুরবানীর চামড়া এবং নফল দান সমূহ “কুল্লী ইখতিয়ারাত” অর্থাৎ যে কোন নেক ও জায়িজ কাজে খরচ করার অনুমতির নিয়্যতে দান করুন। কেননা; যদি নির্দিষ্ট করে দেয়, যেমন বলে যে, এই দান দা‘ওয়াতে ইসলামীর মাদরাসার জন্য, তবে এখন তা মসজিদ অথবা অন্য কোন বিষয়ে ব্যবহার করা গুনাহ। আদায়কারীরও উচিত, যদি কোন নির্দিষ্ট কাজের জন্য চাঁদা আদায় করে তবে সর্তকতামূলক এটা বলে দেয়া, এই চাঁদার টাকা দা‘ওয়াতে ইসলামী যেখানে উপযুক্ত মনে করবে, সেখানে নেক ও জায়িজ কাজে খরচ করবে। মনে রাখবেন! চাঁদা দানকারী যদি হ্যাঁ সুচক বাক্য বলে এবং সে চাঁদা বা চামড়া ইত্যাদির আসল মালিক হলেই এর অনুমতি সাব্যস্ত হবে। এই জন্য চাঁদা বা চামড়া দাতার কাছ থেকে জিজ্ঞাসা করে নিন যে, এটা কার পক্ষ থেকে? যদি অন্য কারো নাম বলে, সে ক্ষেত্রে তার হ্যাঁ বলা যথেষ্ট হবেনা। আসল মালিকের সাথে ফোন বা অন্য কোন ভাবে যোগাযোগ করে অনুমতি নিয়ে নিন। (যাকাত ও ফিতরা দাতাদের কাছ থেকে ‘কুল্লী ইখতিয়ারাত’ নেওয়ার প্রয়োজন নেই, কেননা; তা শরয়ী হিলার মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়।) মাদানী অনুরোধ: কুরবানী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য ‘বাহারে শরীয়াত’ ৩য় খন্ডের ৩৩৭-৩৫৩ পৃষ্ঠায় দেখুন।
রকসে বিসমল কি বাহারে তো মিনা মে দেখে
দিলে খোননা বা ফাসা খা ভি তড়পনা দেখো।
(হাদায়িকে বখশিশ শরীফ)

শক্ত মাংস গলানোর নিয়ম

বয়স্ক পশুর শক্ত মাংস রান্না করার সময় যদি কাঁচা পেঁপে সাথে দেয়া হয় তাহলে তা তাড়াতাড়ি গলে যায়। শিকে সেঁকা মাংসের মসল্লার সাথেও কাঁচা পেঁপে দেয়া যায়। হোটেলে লোকেরা যে মজা করে করে নিহারী খায়, তাতে প্রায় উট বা বয়স্ক গাভী বা ঐ সমস্ত মহিষীর মাংস (যেটা দুধ দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে) অথবা কলুর বলদ ও ক্ষেতে কাজ থেকে অবসর প্রাপ্ত (RETIRED) অর্থাৎ- বয়স্ক বলদের মাংস) দেয়া হয়ে থাকে। পেঁপের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সেটাকে মোমের ন্যায় নরম করে খাওয়ার উপযোগী করে দেওয়া। এছাড়া চিনি, পুদিনার ডাল ও সুপারীও মাংস গলানোর কাজে আসে। অনেকক্ষণ ধরে চুলায় রাখাতেও মাংস গলে যায়। যখন তরকারী কিংবা পোলাও ইত্যাদি রান্না করবেন তখন মুরগী ইত্যাদির মাংসকে ছোট করে দিন, যাতে ভিতরেও সিদ্ধ হয়ে যায়। অবশ্য বড় কড়াই বা ডেক্সীতে বড় টুকরো রান্না করা হলে আর প্রয়োজন মত তাপ লাগলে সিদ্ধ হয়ে যাবে। (ফয়যানে সুন্নাত, ১ম খন্ড, ৪৩৬ পৃষ্ঠা)

তরকারী পুড়ে গেলে!

উপরিভাগ থেকে মাংস ও মসল্লা বের করে নিন। অন্যপাত্রে তেল দিয়ে পিঁয়াজ লাল করার পর এসব মাংস ও মসল্লা ইত্যাদি দিয়ে আধা কাপ দুধ দিয়ে দিন। দুধের মাধ্যমে  اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلّ পোড়া গন্ধ দূরীভূত হয়ে যাবে। (ফয়যানে সুন্নাত, ১ম খন্ড, ৪৪৬ পৃষ্ঠা)
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥
লিখাটি আমিরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা ইলয়াস আত্তার কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত কুরবানী সম্পর্কিত ঘোড়ার আরোহী রিসালার ৪২-৪৮ নং পৃষ্ঠা থেকে সংগৃহীত। ঘোড়ার আরোহী কুরবানী বিষয়ে এক পূর্ণাঙ্গ এনসাইক্লোপিডিয়া ও মাসআলার বই। বইটির  পিডিএফ বই ফ্রি  ডাউনলোড করুন। 
  • পিডিএফ বই ফ্রি ডাউনলোড লিংক
দাওয়াতে ইসলামীর সকল বাংলা ইসলামীক বইয়ের পিডিএফ লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুন 

মাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন