কালিমা, নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত নিয়ে ইসলামী জীবন

অযুর পদ্ধতি ও দোআ (পর্ব-২)

320

অযুর সময় কা’বা শরীফের  দিকে মুখ করে উঁচু জায়গায় বসা মুস্তাহাব। অযুর জন্য নিয়্যত করা সুন্নাত।  নিয়্যত  না   করলেও    অযু  হয়ে   যাবে,   কিন্তু       সাওয়াব    পাবে    না।    অন্তরের     ইচ্ছাকে “নিয়্যত” বলে।    অন্তরে    নিয়্যত   করার   সাথে সাথে মুখে উচ্চারণ করাও  উত্তম। মুখে এভাবে নিয়্যত করুন যে, আমি আল্লাহ্ তাআলার নির্দেশ পালনার্থে     পবিত্রতা    অর্জন     করার    জন্য    অযু করছি।  بِسْمِ  الله  পড়ে নিন”।      এটাও  সুন্নাত। বরং  بِسْمِ   اللهِ   وَالْحَمْدُ   لِلّٰه  বলে  নিন।  এর  কারণে আপনি  যতক্ষণ   অযু অবস্থায় থাকবেন   ততক্ষণ ফিরিস্তাগণ       আপনার       জন্য       নেকী       লিখতে  থাকবেন।   (আল    মু’জামুস   সগীর  লিত তাবারানী, ১ম খন্ড, ৭৩ পৃষ্ঠা, হাদীস-১৮৬)

অযুর পদ্ধতি
এখন   উভয়   হাত   কব্জি    পর্যন্ত   তিনবার    করে  ধৌত    করুন।     (পানির    নল    বন্ধ   করে)   উভয় হাতের আঙ্গুলগুলোও      খিলাল      করে      নিন।  কমপক্ষে     তিনবার    করে   ডানে   বামে,   উপরে নিচে     দাঁতগুলো  “মিসওয়াক   করুন।   প্রত্যেক বারে  মিসওয়াক   ধুয়ে  নিন।  হুজ্জাতুল   ইসলাম ইমাম      মুহাম্মদ     বিন মুহাম্মদ      বিন     মুহাম্মদ গাযালী  رَحۡمَۃُ   اللّٰہ    ِتَعَالٰی   عَلَیہِ     বলেন:   মিসওয়াক করার   সময়   নামাযে   ক্বিরাত পাঠ   ও  আল্লাহর যিকিরের  জন্য  মুখ   পবিত্র  করার   নিয়্যত  করা  উচিত।”   (ইহ্ইয়াউল   উলুম,   ১ম   খন্ড,   ১৮২  পৃষ্ঠা) 

অতঃপর   ডান  হাতে  তিন  অঞ্জলী   পানি নিয়ে     (প্রতি     বারে     পানির     নল     বন্ধ     করে)  এমনভাবে তিনবার কুলি করবেন যেন প্রতিবারে মুখের  ভিতরের  পুরো  জায়গায়  পানি  প্রবাহিত  হয়। রোজাদার না হলে গড়গড়াও করে নিন। তারপর       ডানহাতেরই       তিন       অঞ্জলী       পানি  (প্রতিবারে    আধা    অঞ্জলী পানি     যথেষ্ট)   দিয়ে (প্রতিবারে    পানির    নল     বন্ধ      করে)    তিনবার  নাকের       ভিতর        নরম        মাংস       পর্যন্ত পানি পৌঁছাবেন।    রোযাদার    না    হলে    নাকের    মূল  (গোড়া) পর্যন্ত পানি পৌঁছিয়ে দিন। বাম হাতের সাহায্যে   নাক  পরিষ্কার   করে   নিন  এবং   ছোট আঙ্গুল   নাকের  ছিদ্রে  প্রবেশ   করান।     তিনবার পুরো মুখমন্ডল  এমনভাবে   ধুয়ে  নিন,  যেখান  থেকে স্বাভাবিক ভাবে মাথার চুল গজায় সেখান থেকে চিবুকের   নিচ  পর্যন্ত   এবং   এক     কানের লতি    থেকে   অপর    কানের     লতি   পর্যন্ত   পুরো সীমায় পানি প্রবাহিত   করুন।  যদি দাঁড়ি থাকে এবং   আপনি   ইহরাম   পরিধানকারী   না   হউন,  তাহলে  (পানির  নল বন্ধ  করে)  এভাবে  দাঁড়ি  খিলাল   করুন     যে,    আঙ্গুল    গুলো   গলার   দিক থেকে  প্রবেশ   করিয়ে সামনের দিক থেকে বের করিয়ে দিন। অতঃপর আঙ্গুলের মাথা থেকে শুরু করে  কনুই সহ তিনবার ডান হাত ধৌত  করুন, এভাবে বাম হাতও ধৌত করুন। উভয়হাত অর্ধ বাহু   পর্যন্ত   ধোয়া   মুস্তাহাব।   {অধিকাংশ লোক অঞ্জলিপূর্ণ     পানি     নিয়ে     হাতের     কোষ     হতে  তিনবার    এমনভাবে    পানি     ছেড়ে   দেয়   যেন  কনুই পর্যন্ত  পানি  প্রবাহিত  হয়ে  যায়।  এরকম  করা   উচিত  নয়।  কারণ  এতে  কনুই   ও  বাহুর  চতুর্পাশ্বে     পানি না    পৌঁছার    আশঙ্কা     থাকে।  অতএব    বর্ণিত    নিয়মেই    হাত    ধৌত    করবে। এতে    কনুই   পর্যন্ত অঞ্জলীপূর্ণ    পানি    প্রবাহিত  করার     প্রয়োজন    নেই    বরং    (শরয়ী     অনুমতি ছাড়া)  এরকম  করা  পানির অপচয়।}অতঃপর  (পানির   নল  বন্ধ  করে)   মাথা    মাসেহ   এভাবে  করুন  যে, দুই  বৃদ্ধাঙ্গুলি ও শাহাদাত  আঙ্গুলীদ্বয় বাদ   দিয়ে  দুই  হাতের  বাকি  তিন  তিন   আঙ্গুল সমূহ পরস্পর মিলিয়ে    নিন এবং  কপালের চুল অথবা   চামড়ার   উপর   রেখে   পিছনের       অংশ পর্যন্ত এমনভাবে টেনে নিয়ে যাবেন যেন হাতের তালুগুলো    মাথা    থেকে  পৃথক  থাকে।  তারপর হাতের   তালুগুলো   পিছন   থেকে   কপাল   পর্যন্ত এমনভাবে   টেনে   আনবেন    যেন    বৃদ্ধাঙ্গুলী   ও   শাহাদাত আঙ্গুলীদ্বয় মাথার সাথে স্পর্শ না হয়। অতঃপর শাহাদাত  আঙ্গুলীদ্বয় দ্বারা দুই  কানের ভিতরের  অংশ  এবং  বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়  দ্বারা  কানের বাহিরের           অংশ            মাসেহ            করুন            এবং কনিষ্ঠাঙ্গুলীদ্বয় দুই কানের ছিদ্রে  প্রবেশ করিয়ে দিন   এবং আঙ্গুলগুলোর      পিঠ   দিয়ে    ঘাড়ের পিছনের  অংশ   মাসেহ  করুন। কিছু কিছু  লোক গলা   ধৌত করে,হাতের    কনুই   ও    কব্জিদ্বয় মাসেহ    করে  থাকেন।  এটা   কিন্তু    সুন্নাত  নয়। মাথা  মাসেহ  করার পূর্বে পানির নল ভালভাবে বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। অনর্থক পানির নল     খোলা   রাখা   কিংবা অর্ধেক    বন্ধ     রাখার (কারণে  ফোঁটা ফোঁটা  পানি ঝরতে থাকে) এটা গুনাহ্   ও   অপচয়।   অতঃপর প্রথমে   ডান   পা,  তারপর   বাম  পা  প্রত্যেকবার  আঙ্গুল  হতে  শুরু  করে গোড়ালির উপরিভাগ পর্যন্ত তিনবার ধৌত করুন।তবে    মুস্তাহাব   হলো,   অর্ধ   গোছা    পর্যন্ত তিনবার ধৌত করা। উভয় পায়ের আঙ্গুল সমূহ খিলাল করা সুন্নাত। খিলালের সময় পানির নল বন্ধ      রাখুন।     পায়ের     আঙ্গুল      খিলাল করার মুস্তাহাব   পদ্ধতি  হচ্ছে,   বাম  হাতের  কনিষ্ঠাঙ্গুল দ্বারা    প্রথমে    ডান    পায়ের     কনিষ্ঠাঙ্গুল    থেকে বৃদ্ধাঙ্গল      পর্যন্ত     তারপর     সে       বাম      হাতেরই কনিষ্ঠাঙ্গুল   দ্বারা    বাম   পায়ের    বৃদ্ধাঙ্গল    থেকে কনিষ্ঠাঙ্গুল পর্যন্ত খিলাল করা। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম      মুহাম্মদ      বিন     মুহাম্মদ     বিন     মুহাম্মদ গাযালী  رَحۡمَۃُ  اللّٰہ  ِتَعَالٰی   عَلَیہِ  বলেন:   “অযুর  মধ্যে প্রতিটি  অঙ্গ  ধৌত  করার    সময়  যেন  এ  আশা   করা হয় যে, আমার  এ  অঙ্গের গুনাহ্ বের  হয়ে (ঝরে)  যাচ্ছে।”  (ইহ্ইয়াউল  উলুম,   ১ম   খন্ড, ১৮৩ পৃষ্ঠা)

অযুর    অবশিষ্ট     পানির     মধ্যে    ৭০টি    রোগের  শিফা

লোটা  ইত্যাদিতে  অযু   করার  পর বেঁচে যাওয়া  পানি দাঁড়িয়ে পান করার মধ্যে শিফা রয়েছে যেমনিভাবে-     আমার    আক্বা,     আ’লা      হযরত, ইমামে    আহলে    সুন্নাত   মাওলানা   শাহ্    ইমাম আহমদ রযা খাঁন رَحۡمَۃُ اللّٰہ ِتَعَالٰی عَلَیہِ “ফতোওয়ায়ে রযবীয়ার”   (সংকলিত)    ৪র্থ    খন্ডের,    ৫৭৫  থেকে   ৫৭৬ পৃষ্ঠায় বর্ননা  করেন:  অযুর  বেঁচে যাওয়া পানির জন্য  শরয়ী  ভাবে মর্যাদা রয়েছে এবং নবী করীম, রউফুর  রহীম صَلَّی  اللهُ تَعَالٰی   عَلَیۡہِ وَاٰلِہٖ وَسَلَّم থেকে  প্রমাণীত। হুযুর  صَلَّی  اللهُ تَعَالٰی   عَلَیۡہِ  وَاٰلِہٖ  وَسَلَّم  অযু  করার পর অবশিষ্ট  বেঁচে  যাওয়া  পানি  দাঁড়িয়ে  পান  করে  ছিলেন  এবং  একটি  হাদীসের  মধ্যে    বর্ণনা    করা হয়েছে  যে,  সেটা পান   করা   ৭০টি   রোগের   জন্য   শিফা   স্বরূপ।  তবে     সেটা   ঐ  বিষয়ে  যমযমের পানির   সাথে  সামঞ্জস্য রাখে, এই ধরণের পানি দ্বারা ইস্তিন্জা করা    উচিত   নয়।     তানবিরুল    আবছার নামক কিতাবে অযুর      আদবের    মধ্যে   এটাও    বর্ণিত হয়েছে;   অযু   করার   পর   অযুর   অবশিষ্ট   পানি কিবলার    দিকে মুখ    করে  দাঁড়িয়ে  পান  করে নিন। আল্লামা আব্দুল গণি নাবুলুছি   رَحۡمَۃُ اللّٰہ ِتَعَالٰی عَلَیہِ বলেন:     আমি পরীক্ষা   করে   দেখেছি   যে, যখন আমি অসুস্থ হই, তখন অযুর অবশিষ্ট পানি দ্বারা শিফা (আরোগ্য) লাভ    করি।      নবীয়ে রহমত, শফিয়ে উম্মত, মুস্তফা জানে রহমত صَلَّی اللهُ      تَعَالٰی     عَلَیۡہِ      وَاٰلِہٖ    وَسَلَّم    এর সঠিক     নবুয়তি চিকিৎসার মধ্যে পাওয়া ইরশাদের উপর ভরসা করে আমি এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছি।

صَلُّوْا عَلَی الْحَبِیْب!    صَلَّی اللهُ تَعَالٰی عَلٰی مُحَمَّد

জান্নাতের আটটি দরজা খুলে যায়

পবিত্র      হাদীসে      বর্ণিত      আছে:      “যে       ব্যক্তি  ভালভাবে    অযু    করলো    অতঃপর    আসমানের  দিকে দৃষ্টি দিলো এবং কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করলো, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেয়া হয়। সে যেটা দিয়ে ইচ্ছা করে সেটা দিয়ে জান্নাতে      প্রবেশ     করতে      পারবে।”     (সুনানে দারমী, ১ম খন্ড, ১৯৬ পৃষ্ঠা, হাদীস- ৭১৬)


দৃষ্টিশক্তি কখনো দূর্বল হবে না

যে  ব্যক্তি  অযু  করার    পর  আসমানের  তাকিয়ে “সূরায়ে  কদর”  পাঠ  করবে,  اِنۡ  شَآءَ  اللّٰہ  عَزَّوَجَلَّ  তার       দৃষ্টিশক্তি         কখনো       দূর্বল       হবে       না। (মাসায়িলুল কোরআন, ২৯১ পৃষ্ঠা)

অযুর পর “সুরায়ে কদর” পড়ার ফযীলত

হাদীস  শরীফে  বর্ণিত   আছে:   “যে    ব্যক্তি   অযু  করার     পর  একবার  ‘সূরা  কদর’  পাঠ  করবে,   তাকে সিদ্দীকীনদের এবং যে ব্যক্তি দুইবার পাঠ করবে  তাকে শহীদদের মর্যাদা দান করা হবে। আর যে ব্যক্তি তিনবার (সূরা কদর) পাঠ করবে, তাকে      আল্লাহ্      তাআলা      হাশরের      ময়দানে  নবীদের    সাথে    হাশর করাবেন।”       (কানযুল উম্মাল,        ৯ম      খন্ড,       ১৩২      পৃষ্ঠা,       হাদীস-  ২৬০৮৫।  আল   হাভী   লিল  ফতোওয়ায়ে  লিস সুয়ূতী, ১ম খন্ড, ৪০২ পৃষ্ঠা)

صَلُّوْا عَلَی الْحَبِیْب!    صَلَّی اللهُ تَعَالٰی عَلٰی مُحَمَّد

অযুর পর পাঠ করার দোয়া (শুরু ও শেষে দরূদ শরীফ)

যে ব্যক্তি অযু করার পর এই কলেমাটি পড়বে:
سُبْحٰنَكَ  اللّٰہُمَّ  وَبِحَمْدِكَ اَشْهَدُ  اَنْ لَّاۤ  اِلٰهَ  اِلَّا اَنْتَ     اَسْتَغْفِرُكَ وَاَتُوْبُ اِلَيْكَ ــ
অনুবাদ: তোমার সত্ত্বা    পবিত্র আর   হে  আল্লাহ্! তোমার   জন্য  সমস্ত  প্রশংসা,   তুমি  ছাড়া  আর কোন মাবুদ  নাই।    তোমার  কাছে ক্ষমা প্রার্থনা  করছি এবং তোমার দরবারে তাওবা করছি।
তখন এর উপর মোহর লাগিয়ে  আরশের নীচে  রেখে  দেওয়া  হয়   এবং   কিয়ামতের  দিন   এটা পাঠকারীকে     দিয়ে     দেওয়া       হবে।      (শুয়াবুল ঈমান, ৩য় খন্ড, ২১ পৃষ্ঠা, নাম্বার- ২৭৫৪)

অযুর পর এ দোয়াটি পড়ে  নিন (শুরু ও   শেষে দরূদ শরীফ)

اَللّٰہُمَّ   اجْعَلْنِیْ مِنَ  التَّوَّابِیْنَ وَاجْعَلْنِیْ مِنَ الْمُتَطَہِّرِیْنَ 

অনুবাদ: হে             আল্লাহ্!             আমাকে             বেশি             বেশি  তাওবাকারীগণের    মধ্যে    শামিল    করো    এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের  মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করো।(জামে  তিরমিযী, ১ম খন্ড, ১২১  পৃষ্ঠা, হাদীস-  ৫৫)
♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥

লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা ইলয়াস আত্তার কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত নামায বিষয়ের এনসাইক্লোপিডিয়া ও মাসাইল সম্পর্কিত “নামাযের আহকাম” নামক কিতাবের ৬-১১ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। কিতাবটি নিজে কিনুন, অন্যকে উপহার দিন।

যারা মোবাইলে (পিডিএফ) কিতাবটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন অথবা প্লে স্টোর থেকে এই কিতাবের অ্যাপ ফ্রি ইন্সটল করুন

দাওয়াতে ইসলামীর সকল বাংলা ইসলামীক বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুন
অযু বিষয়ক আরো পড়ুন প্রথম পর্ব তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্ব পঞ্চম পর্ব ষষ্ঠ পর্ব সপ্তম পর্ব

মাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন