কালিমা, নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত নিয়ে ইসলামী জীবন

সাহরী ও ইফতারী: ফযিলত ও বিধানাবলী

329

সাহারী খাওয়া সুন্নত

আল্লাহ তাআলার কোটি কোটি অনুগ্রহ যে, তিনি আমাদেরকে রোযার মতো মহান নে’মত দান করেছেন। আর সাথে সাথে শক্তি অর্জনের জন্য সাহারীর শুধু অনুমতি দেন নি, বরং এতে আমাদের জন্য সাওয়াব রেখে দিয়েছেন। আমাদের প্রিয় আকা, মাদানী ওয়ালে মোস্তফা হযরত মুহাম্মদ যদিও আমাদের মতো পানাহারের মুখাপেক্ষী নন, তবুও আমাদের প্রিয় আকা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা আমরা গোলামদের খাতিরে সাহারী করতেন, যাতে প্রিয় গোলামগণ তাদের দয়ালু মুনিব, সৃষ্টিকুলের বাদশাহ হযরত মুহাম্মদ এর সুন্নত মনে করে সাহারী করে নেয়। অনুরূপভাবে তারা দিনের বেলায় রোযা পালনে শক্তির সাথে সাথে সুন্নতের উপর আমল করার সাওয়াবও পেয়ে যায়। কোন কোন ইসলামী ভাইকে দেখা যায় যে, কখনো কখনো তাঁরা সাহারী করেন না। তখন সকালে নানা ধরনের কথা রচনা করে আর এভাবে বলে বেড়াতে শোনা যায়, “আমরা তো সাহারী ছাড়াই রোযা রেখে ফেলেছি।” মক্কী-মাদানী আকা হযরত মুহাম্মদ এর আশিকরা! সাহারী ছাড়া রোযা রাখার মধ্যে গর্বের কিছুই নেই, যার উপর গর্ব করা হচ্ছে বরং সাহারীর সুন্নত হাতছাড়া হয়ে যাবার জন্য লজ্জিত হওয়া চাই। আফসোস করা চাই। কারণ, তাজদারে রিসালাত হযরত মুহাম্মদ এর এক মহা সুন্নত হাতছাড়া হয়ে গেছে।
সাহরী ও ইফতার

হাজার বছরের ইবাদত অপেক্ষাও উত্তম

হযরত সায়্যিদুনা শায়খ শরফুদ্দীন ওরফে বাবা বুলবুল শাহ رحمة الله عليه বলেন, “আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’আলা আমাকে তাঁর রহমত দ্বারা এতো বেশি শক্তি দান করেছেন যে, আমি পানাহার এবং কোন আসবাবপত্র ছাড়াই জীবন যাপন করতে পারি। কিন্তু যেহেতু এসব বিষয় বর্জন করা মদীনার সুলতান, রহমতে আলামিয়ান হযরত মুহাম্মদ ﷺ এর সুন্নত নয়, সেহেতু আমি এগুলো থেকে বিরত থাকিনা। আমার নিকট সুন্নতের অনুসরণ হাজার বছরের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।”
মোট কথা সমস্ত কর্মের সৌন্দর্য মাহবুবে রব্বে যুল জালাল এর সুন্নতের অনুসরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

ঘুমানোর পর সাহারীর অনুমতি ছিলো না

প্রাথমিক অবস্থায় রাতে ঘুম থেকে ওঠে সাহারী করার অনুমতি ছিলো না। রোযা পালনকারীর জন্য সূর্যাস্তের পর শুধু ওই সময় পর্যন্ত পানাহার করার অনুমতি ছিলো, যতক্ষণ পর্যন্ত সে ঘুমিয়ে না পড়ে। যদি ঘুমিয়ে পড়ে তবে পুনরায় জাগ্রত হয়ে পানাহার করা নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আপন প্রিয় বান্দাদের উপর মহা অনুগ্রহ করেছেন-সাহারীর অনুমতি দান করেছেন। তার কারণ এটা এমনই ছিলো, যেমন ‘কানযুল ঈমান’ শরীফের তফসীর ‘খাযাইনুল ইরফানে’ হযরত সদরুল আফাযিল মওলানা সায়্যিদ নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী رحمة الله عليه উল্লেথ করেছেন:

সাহারীর অনুমতির ঘটনা 

হযরত সায়্যিদুনা সারমাহ্ ইবনে কায়স رضى الله عنه খেটে খাওয়া (পরিশ্রমী) লোক ছিলেন। একদিন রোযা পালনকালে আপন জমিতে সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় ঘরে আসলেন। তার সম্মানিতা স্ত্রী رضى الله عنها এর নিকট খাবার চাইলেন তখন তার স্ত্রী রান্নার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। চোখে ঘুম এসে গেলো। খাবার তৈরী করে যখন তাঁকে জাগ্রত করলেন, তখন তিনি আহার করতে অস্বীকার করলেন। কেননা, তখনকার সময় (সূর্যাস্তের পর) ঘুমিয়ে পড়ে এমন লোকের জন্য পানাহার নিষিদ্ধ ছিল। তাই তিনি পানাহার ছাড়াই পরদিনও রোযা রেখে দিলেন। ফলে তিনি দূর্বল হয়ে বেহুশ হয়ে পড়লেন। সুতরাং তাঁর প্রসঙ্গে এ আয়াত শরীফ অবর্তীণ হলো:
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ:
এবং আহার করো ও পান করো, যতক্ষণ না তোমাদের জন্য প্রকাশ পেয়ে যায় সাদা রেখা কালো রেখা থেকে ফজর হয়ে। অতঃপর রাত আসা পর্যন্ত রোযা পূরণ করো। (পারা-২, সূরা-বাকারা, আয়াত-১৮৭)
এ পবিত্র আয়াতে রাতকে কালো রেখা ও সুবহে সাদিককে সাদা রেখার সাথে উপমা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের জন্য রমযানুল মুবারকের রাতগুলোতে পানাহার করা মুবাহ্। (অর্থাৎ বৈধ সাব্যস্ত হলো।)
এ থেকে একথাও জানা গেলো যে, ফজরের আযানের সাথে রোযার সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ ফযরের আযান চলাকালে পানাহার করার কোন বৈধতাই নেই। আযান হোক কিংবা না-ই হোক, আপনার কানে, আওয়াজ আসুক কিংবা না-ই আসুক! সোবহে সাদিক শুরু হতেই আপনার পানাহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।

সাহারীর ফযীলত সম্পর্কে ৯টা বরকতময় হাদীস

১. “সাহারী খাও! কারণ সাহারীতে বরকত রয়েছে।” (সহীহ বোখারী, পৃ-৬৩৩, হাদীস নং-১৯২৩)
২. “আমাদের ও কিতাবী সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, সাহারী খাওয়া।” (আল ইহসান বিতরতীবে সহীহ মুসলিম, খন্ড-১ম, পৃ-৫৫২, হাদীস নং-১০৯৬)
৩. “আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ সাহারী আহারকারীদের উপর রহমত নাযিল করেন।” (সহীহ ইবনে হাব্বান, খন্ড-৫ম, পৃ-১৯৪, হাদীস নং-৩৪৫৮)
৪. নবী করীম, রঊফুর রহীম হযরত মুহাম্মদ নিজের সাথে যখন কোন সাহাবী رضى الله عنه কে সাহারী খাওয়ার জন্য ডাকতেন, তখন ইরশাদ করতেন, “এসো! বরকতের খাবার খেয়ে যাও!” (সুনানে আবু দাউদ, খন্ড-২য়, পৃ-৪৪২, হাদীস নং-২৩৪৪)
৫. “রোযা রাখার জন্য সাহারী খেয়ে শক্তি অর্জন করো, আর দিনে (অর্থাৎ দুপুরে) আরাম (অর্থাৎ দুপুরে বিশ্রাম) করে রাতে ইবাদত করার জন্য শক্তি অর্জন কর!” (সুনানে ইবনে মাজাহ, ২য় খন্ড, পৃ-৩২১, হাদীস নং-১৬৯৩)
৬. “সাহারী বরকতের বস্তু, যা আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে দান করেছেন। এটা কখনো ছাড়বে না।” (নাসায়ী আসসুনানুল কুবরা, খন্ড-২য়, পৃ-৭৯, হাদীস নং-২৪৭২)
৭. “তিনজন লোক যতটুকু খেয়ে নেবে, اِنْ شَاءَ الله عَزَّوَجَلَّ তাদের কোন হিসাব নিকাশ হবে না। এ শর্তে যে, খাদ্য যদি হালাল হয়। তারা হলো, “১. রোযাদার, ২. সাহারী আহারকারী ও ৩. মুজাহিদ, যে আল্লাহর পথে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা-রক্ষীর কাজ করে।” (আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব, খন্ড-২য়, পৃ-৯০, হাদীস নং-০৯)
৮. “সাহারী হচ্ছে সম্পূর্ণটাই বরকত। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো না। চাই এমনই অবস্থা হয় যে, তোমরা এক ঢোক পানি পান করে নেবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ও তাঁর ফিরিশতাগণ সাহারী আহারকারীদের উপর রহমত প্রেরণ করেন।” (মুসনাদে ইমাম আহমদ, খন্ড-৪র্থ, পৃ-৮৮, হাদীস নং-১১৩৯৬) 
রহমতে কাওনাঈন, নানা-ই-হাসনাঈন হযরত মুহাম্মদ এর এসব বাণী থেকে আমরা এ শিক্ষা পাই যে, সাহারী আমাদের জন্য একটা বড় নে’মত, যা দ্বারা অগণিত দৈহিক ও আত্মিক উপকার পাওয়া যায়। এ কারণে হুযুর সেটাকে বরকতময় খাবার বলেছেন। যেমন-
৯. হযরত সায়্যিদুনা ইরবাদ্ব ইবনে সারিয়াহ رضى الله عنه বর্ণনা করেছেন, একবার রমযানুল মুবারকে আল্লাহর রসূল হযরত মুহাম্মদ ﷺ আমাকে নিজের সাথে সাহারী খাওয়ার জন্য ডাকলেন। আর ইরশাদ করলেন, “এসো! মুবারক খাবারের জন্য।”(সুনানে আবু দাউদ, খন্ড ২য়, পৃ-৪৪২, হাদীস নং-২৩৪৪)

রোযার জন্য কি সাহারী পূর্বশর্ত?

কারো মনে যেন এ ভুল ধারণা না আসে যে, সাহারী রোযার জন্য পূর্বশর্ত। বাস্তবে এমন নয়, বরং সাহারী ছাড়াও রোযা শুদ্ধ হবে। কিন্তু জেনে বুঝে সাহারী না করা উচিত নয়। কারণ, এটা একটা মহান সুন্নত থেকে বঞ্চিত হওয়া। এটাও যেনো মনে থাকে যে, সাহারীতে প্রচুর পরিমাণে খাওয়া জরুরী নয়। কয়েকটা খেজুর ও পানিই যদি সাহারীর নিয়্যতে খেয়ে নেয়া হয় তবেও যথেষ্ট বরং খেজুর ও পানি দ্বারা সাহারী করা তো সুন্নতই।

খেজুর ও পানি দ্বারা সাহারী খাওয়া সুন্নত

যেমন, হযরত সায়্যিদুনা আনাস ইবনে মালিক رضى الله عنه বলেন, তাজেদারে মদীনা হযরত মুহাম্মদ ﷺ সাহারীর সময় আমাকে ইরশাদ করতেন, “আমি রোযা রাখতে চাই, আমাকে কিছু আহার করাও।” সুতরাং আমি কিছু খেজুর এবং একটা পাত্রে পানি পেশ করতাম।” (নাসাঈকৃত আসসুনানুল কোবরা, খন্ড-২য়, পৃ-৮০, হাদীস নং-২৪৭৭)

খেজুর হচ্ছে সর্বোত্তম সাহারী

রোযাদারের জন্য একেতো সাহারী করা সুন্নত দ্বিতীয়তঃ খেজুর ও পানি দিয়ে সাহারী করা সুন্নত; বরং খেজুর দিয়ে সাহারী করার জন্য তো আমাদের আক্বা ও মওলা, মদীনে ওয়ালে মুস্তফা হযরত মুহাম্মদ আমাদের উৎসাহিত করেছেন। যেমন- সায়্যিদুনা সা-ইব ইবনে ইয়াযীদ رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, তাজদারে মদীনা, সুরুরে কলবো সীনা হযরত মুহাম্মদ ইরশাদ করেছেন, نِعْمَ السَّحُوْرُ التَّمْرُ (অর্থাৎ খেজুর হচ্ছে সর্বোত্তম সাহারী।)” (আত্তারহীব ওয়াত্তারহীব, খন্ড-২য়, পৃ-৯০, হাদীস নং-১২) 
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, نِعْمَ السَّحُوْرُ المُوْمِنِ التَّمْرُ (অর্থাৎ খেজুর হচ্ছে মু’মিনের সর্বোত্তম সাহারী।)” (সুনানে আবু দাঊদ, খন্ড-২য়, পৃ-৪৪৩, হাদীস নং-২৩৪৫)
খেজুর ও পানি একত্রে খাওয়াও সাহারীর জন্য পূর্বশর্ত নয়। সামান্য পানিও যদি সাহারীর নিয়্যতে পান করা হয়, তবে দ্বারাও সাহারীর সুন্নত পালন হয়ে যাবে।

সাহারীর সময় কখন হয়?

আরবী ভাষায় প্রসিদ্ধ কিতাব ‘কামূস’ (অভিধান) এর মধ্যে ‘সাহার’ সম্পর্কে লিখা হয়েছে, “সাহার” ওই খাবারকে বলে, যা ভোর বেলায় খাওয়া হয়।” হানাফী মাযহাবের মহান পেশাওয়া হযরত মওলানা মোল্লা আলী কারী رحمة الله عليه বলেন, “কারো কারো মতে সাহারীর সময় অর্ধরাত থেকে শুরু হয়।” (মিরকাতুল মাফাতীহ, শরহে মিশকাতিল মাসাবীহ, খন্ড-৪র্থ, পৃ-৪৭৭) 

সাহারী দেরীতে খাওয়া উত্তম

যেমন হাদীসে মুবারকে ইরশাদ হয়েছে, হযরত সায়্যিদুনা ইয়া’লা ইবনে মুররাহ رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, প্রিয় সারকার, মদীনার তাজদার হযরত মুহাম্মদ ইরশাদ করেছেন, “তিনটি জিনিসকে আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন: ১. ইফতারে তাড়াতাড়ি করা, ২. সাহারীতে দেরী করা ৩. নামাযে দাঁড়ানোর সময় হাতের উপর হাত রাখা।” (আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব, খন্ড-২য়, পৃ-৯১, হাদীস নং-০৪)

‘সাহারীতে দেরী’ বলতে কোন সময়টিকে বুঝায়?

সাহারীতে দেরী করা মুস্তাহাব। দেরীতে সাহারী করলে বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়। এখানে মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ‘দেরী’ বলতে কোন সময়ের কথা বুঝায়। হযরত মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী رحمة الله عليه তফসীরে নঈমীতে লিখেছেন, “এটা দ্বারা রাতের ষষ্ঠ অংশ বুঝায়।” তার পরও মনে প্রশ্ন থেকে যায়- “রাতের ষষ্ঠ অংশ কীভাবে বুঝা যায়?” এর জবাব হচ্ছে, ‘সূর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত সময়সীমাকে রাত বলে।’ যেমন, কোন দিন সন্ধ্যা সাতটার সময় সূর্য অস্ত গেলো। তারপর চারটার সময় সুবহে সাদিক হলো। এভাবে সূর্যাস্ত থেকে শুরু করে যে নয় ঘন্টার বিরতি অতিবাহিত হলো সেটাকেই রাত বলে। এখন রাতের এ ৯ ঘন্টাকে সমান ছয়ভাগে ভাগ করুন! প্রতিটি ভাগ দেড় ঘন্টারই হয়ে থাকে। এখন রাতে শেষ দেড় ঘন্টা (রাত আড়াইটা থেকে ৪টা পর্যন্ত) এর মধ্যে সুবহে সাদিকের পূর্বে যখনই সাহারী করবেন, তা-ই দেরীতে সাহারী করা হলো। সাহারী ও ইফতারের সময় সাধারণতঃ প্রত্যেকদিন পরিবর্তিত হতেই থাকে। বর্ণিত নিয়মানুসারে যখনই চান রাতের ষষ্ঠ অংশ বের করতে পারেন। যদি রাতে সাহরী করে নেন, আর রোযার নিয়্যতও করে ফেলে থাকেন, বরং সাধারণ লোকের পরিভাষায় ‘রোযাবন্ধ’ও করে ফেলে থাকেন, তবুও রাতের বাকী অংশ সুবহে সাদিক শেষ হওয়া পর্যন্ত যখনই চান পানাহার করতে পারেন। নতুনভাবে নিয়্যত করার দরকার নেই।
ফজরের আযান নামাযের জন্যই, সাহরী খাওয়া বন্ধ করার জন্য নয়
সাহারীতে এতো বিলম্বও করবেন না যে, সুবহে সাদিক হয়ে গেলো কিনা সন্দেহ হয়ে যায়। যেমন, কেউ কেউ সুবহে সাদিকের পর ফজরের আযান হচ্ছে, এদিকে সে কিন্তু পানাহার করতেই থাকে। যদি আহার না করে, তবে পানি পান করে হলেও অবশ্যই তখন সেহরী খাওয়া শেষ করে থাকে। আহা! বেচারাগণ এভাবে সেহরী খাওয়া তো করে, কিন্তু রোযাকে এভাবে তারা একেবারে খোলা অবস্থায়ই ছেড়ে দেয়। বস্তুত: এভাবে হবেই না। সারা দিন ক্ষুধা-পিপাসা ছাড়া কিছুই তার হস্তগত হয় না। সেহরী খাওয়ার শেষ সময়ের সম্পর্ক আযানের সাথে নয়, সুবহে সাদিকের আগেভাগেই পানাহার বন্ধ করা জরুরী। যেমন, ইতোপূর্বে উল্লেখিত পবিত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় গত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মুসলমানকে ‘সুস্থ বিবেক’ দান করুন! আর সঠিক সময়ের জ্ঞান অর্জন করে রোযা-নামায ইত্যাদি ইবাদত বিশুদ্ধভাবে পালন করার তওফীক দান করুন। আমীন! বিজাহিন্নাবিয়্যিল আমিন 

পানাহার বন্ধ করে দিন

আজকাল ইলমে দ্বীন থেকে দূরে থাকার কারণে সাধারণ মানুষের নিকট এ নিয়ম প্রচলিত আছে যে, তারা আযান বা সাইরেন এর উপর সাহারী ও ইফতারের সময় ঠিক করে। বরং কিছু লোক এমন আছে যারা ফজরের আযান দেয়া অবস্থায় সেহরী খাওয়া শেষ করে। এই সাধারণ ভুলকে দূর করার জন্য কতইনা উত্তম হত যে, যদি রমযানুল মোবারক মাসে প্রত্যেকদিন সুবহে সাদিকের ৩ মিনিট পূর্বে প্রত্যেক মসজিদে উঁচু আওয়াজে এইভাবে ৩ বার ঘোষণা করে দেয়া। “রোযাদারগণ! আজ সাহারীর শেষ সময় (যেমন) ৪টা ১২ মিনিটে। সময় শেষ হয়ে এসেছে। দ্রুত পানাহার বন্ধ করে দিন। অবশ্যই আযানের জন্য অপেক্ষা করবেন না। (সাহারী খাওয়ার সময় শেষ হয়ে গেলে) আযান ফযরের নামাযের জন্য দেয়া হবে।” প্রত্যেকেই এই কথা বুঝা দরকার যে ফযরের আযান অবশ্যই অবশ্যই সুবহে সাদিকের পরই হতে হবে। এবং তা সেহরী খাওয়া বন্ধ করার জন্য নয়। বরং শুধুমাত্র ফযরের নামাযের জন্যই দেয়া হয়ে থাকে।

ইফতারের বর্ণনা

যখন সূর্যাস্তের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন ইফতার করতে দেরী করা উচিত নয়; না সাইরেনের অপেক্ষা করবেন, না আযানের। তাৎক্ষণিকভাবে কোন কিছু পানাহার করে নেবেন। কিন্তু খেজুর অথবা খোরমা অথবা পানি দ্বারা ইফতার করা সুন্নত। খেজুর খেয়ে অথবা পানি পান করার পর এই দু’আটি পড়বেন। *

ইফতারের দু’আ

اَللّٰهُمَّ اِنّى لَكَ صُمْتُ وَبِكَ اٰمَنْتُ وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَعَلٰى رِزْقِكَ اَفْطَرتُ

অর্থ: হে আল্লাহ তাআলা! নিশ্চয় আমি রোযা রেখেছি, আমি তোমারই উপর ঈমান এনেছি, তোমারই উপর ভরসা করছি এবং তোমারই রিযক দ্বারা ইফতার করেছি। (আলমগীরী, খন্ড-১ম, পৃ-২০০)
(*) ইফতারের দু‘আ সাধারণতঃ ইফতারের পূর্বে পড়ার প্রচলন আছে, কিন্তু ইমামে আহলে সুন্নত মওলানা শাহ আহমদ রযা খান رحمة الله عليه তার ফাতাওয়ায়ে রযবীয়্যাহ্, খন্ড-৩য়, পৃ-৬০১ তাঁর গবেষণালব্দ মাসআলা এটাই পেশ করেছেন যে, দু‘আ ইফতারের পরে পড়া হবে।

ইফতারের জন্য আযান শর্ত নয়

ইফতারের জন্য আযান শর্ত নয়। না হলে ঐ সমস্ত এলাকায় রোযা কিভাবে খুলবে যেখানে মসজিদ নেই বা আযানের শব্দ আসে না। মূলত: মাগরিবের আযান দেয়া হয় মাগরিবের নামাযের জন্য। যেখানে মসজিদ আছে সেখানে-ই এ নিয়ম চালু করা যাবে। যখনই সূর্যাস্তের ব্যাপারে সন্দেহ হয় তখন উঁচু আওয়াজে বলার পর এইভাবে তিন বার ঘোষণা করে দেয়া যায় যে, “রোযাদারগণ! ইফতার করে নিন।”

ইফতারের এগারটি ফযীলত

১. হযরত সায়্যিদুনা সাহল ইবনে সা‘দ رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, আরব ও অনারবের সুলতান, রহমতে আলামিয়ান হযরত মুহাম্মদ  ইরশাদ করেছেন, “মানুষ সব সময় মঙ্গল সহকারে থাকবে যতদিন তারা ইফতারে তাড়াতাড়ি করবে।” (সহীহ বুখারী, খন্ড-১ম, পৃ-৬৪৫, হাদীস নং-৬৯৫৭)
যখনই সূর্যাস্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়, তখনই দেরী না করে খেজুর অথবা পানি ইত্যাদি দ্বারা ইফতার করে নিন এবং দু’আও ইফতার করেই করুন, যাতে ইফতারে কোন রকম দেরী না হয়।
২. তাজেদারে মদীনা, হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইরশাদ করেন, “আমার উম্মত আমার সুন্নতের উপর থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ইফতারের সময় আকাশে তারকা উদিত হবার জন্য অপেক্ষা করবে না।” (আল ইহসান বিতরতীবে সহীহ ইবনে হাব্বান, খন্ড-৫ম, পৃ-২০৯, হাদীস নং-৩৫০১)
৩. হযরত সায়্যিদুনা আবূ হুুরায়রা رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, প্রিয় আকা তাজদারে মদীনা হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আমার বান্দাদের মধ্যে বেশি প্রিয় হচ্ছে সে-ই, যে ইফতারে তাড়াতাড়ি করে।” (তিরমিযী, খন্ড-২য়, পৃ-১৬৪, হাদীস নং-৭০০)
سُبْحٰنَ الله عَزَّوَجَل প্রিয় হতে চাইলে ইফতারের সময় কোন প্রকারের ব্যস্ততা রাখবেন না। ব্যাস! তাৎক্ষণিকভাবে ইফতার করে নিন! 
৪. হযরত সায়্যিদুনা আনাস ইবনে মালেক رضى الله عنه  বলেন, “আল্লাহর মাহবূব হযরত মুহাম্মদ    কে এভাবে দেখিনি যে, তিনি ﷺ ইফতারের পূর্বে মাগরিবের নামায আদায় করেছেন বরং এক ঢোক পানি হলেও (যথাসময়ে) পান করে নিয়েছেন। অথচ ইফতার করে নিতেন।) (আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব, খন্ড-২য়, পৃ-৯১, হাদীস নং-৯১)
৫. হযরত সায়্যিদুনা আবু হুুরায়রা رضى الله عنه   থেকে বর্ণিত, তাজদারে মদীনা, সুরুরে কলবো সীনা হযরত মুহাম্মদ  ﷺ ইরশাদ করেছেন, “এ দ্বীন ততদিন বিজয়ী থাকবে, যতদিন পর্যন্ত লোকেরা ইফতার তাড়াতাড়ি করতে থাকবে। কারণ, ইহুদী ও খৃষ্টানরাই দেরীতে (ইফতার) করে থাকে।” (সুনানে আবু দাউদ, খন্ড-২য়, পৃ-৪৪৬, হাদীস নং-২৩৫৩)
এ পবিত্র হাদীসেও ইফতার তাড়াতাড়ি করার প্রতি সন্তুষ্ট প্রকাশ করা হয়েছে। ইফতারে দেরী করা যেহেতু ইহুদী ও খৃষ্টানদের কাজ, সেহেতু তাদের মতো কাজ করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
৬. হযরত সায়্যিদুনা যায়দ ইবনে খালিদ জুহানী  رضى الله عنه  থেকে বর্ণিত, তাজদারে মদীনা হযরত মুহাম্মদ   ইরশাদ করেছেন,“যে ব্যক্তি কোন ধর্মীয় যোদ্ধা কিংবা হাজীকে সামগ্রী (পাথেয়) যোগান দিয়েছে, কিংবা তার পেছনে তার পরিবার-পরিজনের দেখাশুনা করেছে, অথবা কোন রোযাদারকে ইফতার করিয়েছে, সেও তার সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে-তাদের সাওয়াবে কোনরূপ কম করা হবে না।“  (নাসায়ীকৃত আসসুনানুল কুবরা, খন্ড-২য়, পৃ-২৫৬, হাদীস নং-৩৩৩০)
سُبْحٰنَ الله عَزَّوَجَل কতোই প্রিয় সুসংবাদ! গাযী (ধর্মীয় যোদ্ধা) কে জিহাদের সামগ্রী যোগান দাতাকে গাযীরই মতো, হজ্জ যাত্রীকে আর্থিক সাহায্য করার জন্য হজ্জের আর ইফতারের ব্যবস্থাকারীকে রোযাদারের মতো সাওয়াব দেয়া হবে। দয়ার উপর দয়া হচ্ছে এ যে, ওইসব লোকের সাওয়াবের মধ্যেও কোনরূপ কম করা হবে না। এটাতো আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ। তবে উল্লেখ্য যে, হজ্জ ও ওমরার জন্য ভিক্ষা করা হারাম। এ ভিক্ষাকারীকে ভিক্ষা দেয়াও গুনাহ্।

ইফতার করানোর মহা ফযীলত

৭. হযরত সায়্যিদুনা সালমান ফারসী رضى الله عنه  থেকে বর্ণিত, মক্কা-মদীনার সুলতান, রহমতে আলামিয়ান হযরত মুহাম্মদ   ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য কিংবা পানীয় দ্বারা (কোন মুসলমান) কে রোযার ইফতার করালো, ফিরিশতাগণ মাহে রমযানের সময়গুলোতে তার জন্য ইস্তিগফার করেন। আর (হযরত) জিব্রাঈল عليه السلام শবে ক্বদরে তার জন্য ইস্তিগফার করেন।” (তাবরানী আল-মু‘জামূল কবীর, খন্ড-৬ষ্ঠ, পৃ-২৬২, হাদীস নং-৬১৬২)
سُبْحٰنَ الله عَزَّوَجَل ! কোরবান হোন আল্লাহর রহমতের উপর!  মাহে রমযানে যদি কোন রোযাদার ইসলামী ভাইকে এক আধটা খেজুর দ্বারা এক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করান, তবে তার জন্য আল্লাহ তাআলার নিষ্পাপ ফিরিশতাগণ রমযানুল মুবারকের সময়গুলোতে আর ফিরিশতাদের সারদার হযরত সায়্যিদুনা জিব্রাঈল عليه السلام শবে কদরে মাগফিরাতের দু‘আ করেন। (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলারই অনুগ্রহের জন্য)।

জিব্রাইল কর্তৃক মুসাফাহার নমুনা

৮. অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে রমযানে রোযার ইফতার করায়, রমযানের সমস্ত রাতে ফিরিশতাগণ তার উপর দুরূদ (রহমত) প্রেরণ করেন, আর শবে ক্বদরে জিব্রাঈল عليه السلام তার সাথে মোসাফাহা করেন। বস্তুতঃ যার সাথে হযরত জিব্রাঈল عليه السلام মোসাফাহা করেন, তার চোখ দুটি আল্লাহ তাআলার ভয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে যায় এবং তার হৃদয় গলে যায়। (কানযুল উম্মাল, খন্ড-৮ম, পৃ-২১৫, হাদীস নং-২৩৬৫৩)

রোযাদারকে পানি পান করানোর ফযীলত

৯. অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, “যে ব্যক্তি রোযাদারকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার ‘হাওয’ থেকে পান করাবেন। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত কখনো পিপাসার্ত হবে না।” (সহীহ ইবনে খুযাইমা, খন্ড-৩য়, পৃ-১৯২, হাদীস নং-১৮৮৭)
১০. হযরত সায়্যিদুনা সালমান ইবনে আমের رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, তাজদারে মদীনা, হযরত মুহাম্মদ   ইরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের মধ্যে কেউ রোযার ইফতার করে, তবে সে যেনো খেজুর কিংবা খোরমা দিয়ে ইফতার করে। কারণ, তা হচ্ছে বরকত। আর তা না হলে পানি দ্বারা করবে, তাতো পবিত্রকারী।” (জামে তিরমিযী, খন্ড-২য়, পৃ-১৬২, হাদীস নং-৬৯৫)
এ হাদীসে পাকে এ উৎসাহ দেয়া হয়েছে যে, সম্ভব হলে খেজুর কিংবা খোরমা দিয়ে যেনো ইফতার করা হয়। কারণ, এটা সুন্নত। আর যদি খেজুর পাওয়া না যায়, তবে যেনো পানি দিয়ে ইফতার করে নেয়া হয়। এটাও পবিত্রকারী।
১১. হযরত সায়্যিদুনা আনাস رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, “শাহানশাহে মদীনা হযরত মুহাম্মদ   নামাযের পূর্বে তাজা-ভেজা খেজুর সমূহ দ্বারা ইফতার করতেন। এটা না থাকলে কয়েকটা খোরমা দিয়ে আর তাও না থাকলে কয়েক (গ্লাস) পানি দ্বারা ইফতার করে নিতেন। (সুনানে আবু দাউদ, খন্ড-২য়, পৃ-৪৪৭, হাদীস নং-২৩৫৬)
এ হাদীসে পাকে ইরশাদ হয়েছে যে, আমাদের প্রিয় আকা হযরত মুহাম্মদ   প্রথমতঃ ভেজা-তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতে পছন্দ করতেন, যদি তা না থাকতো তবে শুকনা খেজুর (খোরমা) দিয়ে, তাও না থাকলে পানি দিয়ে ইফতার করতেন। সুতরাং আমাদের প্রচেষ্টাও এটাই থাকা উচিত। আমরাও ইফতারের জন্য মিষ্ট মিষ্ট খেজুর পাওয়া গেলে, যা প্রিয় আকা ﷺ এর প্রিয় সুন্নত, তা দিয়ে; এটা পাওয়া না গেলে, খোরমা দিয়ে, আর তাও পাওয়া না গেলে পানি দ্বারা ইফতার করে নেবো!
বরকতময় হাদীস সমুহে সাহারী ও ইফতারের ক্ষেত্রে খেজুর ব্যবহারের প্রতি যথেষ্ট উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। খেজুর খাওয়া, খেজুর ভিজিয়ে সেটার পানি পান করা, তা দ্বারা চিকিৎসাপত্র নির্ণয় করা-এ সবই সুন্নত। মোটকথা, এতে অসংখ্য বরকত রয়েছে। এতে অগণিত রোগের চিকিৎসা যেমন

ইফতারের সময় দু‘আ কবুল হয়

রোযাদার কতোই সৌভাগ্যবান হয় যে, সে সব সময় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করতে থাকে। এমনকি যখন ইফতারের সময় আসে তখন সে যে কোন দু’আ-ই করুক, আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগ্রহ ও বদান্যতায় তা কবুল করে নেন। যেমন সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস رضى الله عنهم থেকে বর্ণিত, রহমাতুল্লিল আলামীন, সায়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ ﷺ   এর হৃদয়গ্রাহী বাণী, 

اِنَّ لِلصَّائِمِ عِنْدَ فِطْرِه لَدَعْوَةً مَّاتُرَدُ

অর্থ:  নিশ্চয় রোযাদারের জন্য ইফতারের সময় এমন একটি দু‘আ থাকে, যা ফিরিয়ে দেয়া হয় না (আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব, খন্ড-২, পৃ-৫৩, হাদীস নং -২৯)
হযরত সায়্যিদুনা আবু হুুরায়রা رضى الله عنه  থেকে বর্ণিত, তাজেদারে মদীনা হযরত মুহাম্মদ   এর মহান বাণী, “তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেয়া হয় না :- ১. রোযাদারের, (ইফতারের সময়), ২. ন্যায় বিচারক বাদশাহের এবং ৩. মযলুমের। এ তিন জনের দু’আ আল্লাহ তাআলা মেঘ থেকেও অনেক উচুঁ তুলে নেন এবং আসমানের দরজা তার জন্য খুলে দেয়া হয় এবং আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আমি আমার সম্মানের শপথ করছি! আমি অবশ্যই তোমার সাহায্য করবো, যদিও কিছু দেরিতে হয়।”  (সুনানে ইবনে মাজাহ, খন্ড-২য়, পৃ-৩৪৯, হাদীস নং-১৭৫২)

আমরা পানাহারে লিপ্ত থেকে যাই

প্রিয় রোযাদার! আপনাকে ধন্যবাদ! আপনার জন্য এ সুসংবাদ রয়েছে যে, ইফতারের সময় যে দু’আ-ই করেন কবুল হবার মর্যাদা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু আফসোস! আজকাল আমাদের অবস্থা কিছুটা এমনই আশ্চর্যজনক হয়ে গেছে যে,
দোয়ার সময় দোয়া করবেন না। ইফতারের সময় আমাদের ‘নফস’ বড়ই পরীক্ষায় পড়ে যায়। কেননা, সাধারণতঃ ইফতারের সময় আমাদের সামনে নানা প্রকার ফলমূল, কাবাব, সামুসা, পেয়াজু-বুট ইত্যাদির সাথে সাথে, গরমের মৌসুম হলে তো ঠান্ডা ঠান্ডা শরবতের গ্লাস মওজুদ থাকে। ক্ষুধা-পিপাসার তীব্রতার কারণে আমরা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত তো হয়ে থাকি। ব্যাস! সূর্য অস্ত যেতেই খাদ্য ও শরবতের উপর এমনিভাবে ঝাপিয়ে পড়ি যে, দু’আর কথাও মনে থাকে না; দু’আ দু’আই থেকে যায়।
আমাদের অগণিত ইসলামী ভাই ইফতারের সময় পানাহারে এতো বেশি মগ্ন হয়ে যায় যে, তাঁরা মাগরিবের নামাযও পুরোপুরি পান না; বরং আল্লাহ থেকে পানাহ! কেউ কেউ তো এতো বেশি অলসতা করে যে, ঘরে ইফতার করে সেখানেই জামা’আত ছাড়া নামায পড়ে নেয়। তওবা! তওবা!! ওহে জান্নাত প্রার্থীরা! এতটুকু অলসতা করবেন না! জামাআত সহকারে নামায পড়ার কঠিন তাকীদ এসেছে শরীয়তে। আর সর্বদা মনে রাখবেন! কোন শরীয়তসম্মত বাধ্যবাধকতা ছাড়া মসজিদে নামাযের জামা’আত ছেড়ে দেয়া গুনাহ্।

ইফতারের সতর্কতা সমুহ

উত্তম হচ্ছে এই যে, ১টি বা অর্ধেক খেজুর দ্বারা ইফতার করে দ্রুত মুখ পরিস্কার করে নিবেন এবং জামাআতে শরীক হবেন। আজকাল মানুষ মসজিদে ফলমুল খেয়ে মুখ ভালভাবে পরিস্কার না করে দ্রুত জামাআতে শরীক হয়ে যায়। অথচ খাবারের সামান্য অংশ কিংবা স্বাদ মুখে না থাকা চাই। যেহেতু হযরত মুহাম্মদ   এর বাণী, “কিরামান কাতেবীনের (তথা আমল লিপিবদ্ধকারী দুজন সম্মানিত ফেরেশতা ) নিকট এর চেয়ে কোন কঠিন কিছু নেই যে তারা যার নিকট নির্দিষ্ট থাকে তিনি এমন অবস্থায় নামায পড়তে দেখেন যে, তার দাঁতের ভিতর কিছু (খাদ্য দ্রব্য) থেকে যায়।” (তাবরানী কবীর, খন্ড-৪র্থ, পৃ-১৭৭, হাদীস নং-৪০৬১)
আমার আকা আলা হযরত رحمة الله عليه  বর্ণনা করেন, অনেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে যে, বান্দা যখন নামাযে দাঁড়ায় ফিরিস্তা, তার মুখের সাথে নিজের মুখ রাখে, বান্দা যা পড়ে তা তার মুখ থেকে ফিরিস্তার মুখে প্রবেশ করে, সে সময় যদি কোন খাদ্য দ্রব্য তার মুখে থাকে তাহলে তাতে ফিরিস্তার এত কষ্ট হয় যে, যা অন্য কোন কিছুতে এত কষ্ট হয় না। হুজুরে আকরাম নূরে মুজাসসাম, হযরত মুহাম্মদ ﷺ   ইরশাদ করেছেন, “যখন তোমাদের মধ্যে কেউ রাতে নামাযের জন্য দাঁড়ায় তাহলে সে যেন মিসওয়াক করে নেয়। কেননা সে যখন নিজ নামাযে কিরাত পড়ে তখন ফিরিস্তা তার মুখ ঐ বান্দার মুখের সাথে রাখে এবং যা ঐ বান্দার মুখ থেকে বের হয় তা ঐ ফিরিস্তার মুখে প্রবেশ করে।” (কানযুল উম্মাল, খন্ড-৯ম, পৃ-৩১৯) এবং ইমাম তাবরানী কবীরের মধ্যে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী رضى الله عنه   থেকে বর্ণনা করেন দুই ফিরিস্তার নিকট এর চেয়ে বেশি কঠিন কোন বস্তু নাই যে তারা নিজ সাথীকে নামায পড়তে দেখে, যে অবস্থায় তার দাঁতের ভিতর খাদ্যের অংশ থাকে।” (ফাতাওয়ায়ে রযবীয়্যাহ, খন্ড-১ম, পৃ-৬২৪, ৬২৫) মসজিদে ইফতারকারীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুখ পরিস্কার করতে কষ্টকর হয় যে, ভালভাবে পরিস্কার করতে গেলে জামাআত শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য পরামর্শ রইলো যে শুধুমাত্র এক বা অর্ধেক খেজুর খেয়ে পানি পান করে নিন। পানি মুখের ভিতর ভালভাবে ঘুরিয়ে কুলি করে নিবেন। যাতে খেজুরের মিষ্টি স্বাদ ও অংশ দাঁত থেকে ছুটে পানির সাথে পেটের ভিতর চলে যায়। প্রয়োজন হলে দাঁতে খিলালও করে নিবেন। যদি মুখ পরিস্কার করার সুযোগ না থাকে তখন সহজ ব্যবস্থা হল শুধু পানি দিয়ে ইফতার করে নিন। ঐ সমস্ত রোযাদার আমার নিকট খুব প্রিয়, যারা রকমারী ইফতারীর থালা ফেলে সূর্য ডোবার পূর্বে মসজিদের প্রথম কাতারে খেজুর পানি নিয়ে বসে যায়। এভাবে ইফতার দ্রুত শেষ হয়। মুখ পরিস্কার করাও সহজ এবং প্রথম কাতারে প্রথম তাকবীরের সাথে জামাআতের সাথে নামায আদায় করাও নছীব হয়।

♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥♥

লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা ইলয়াস আত্তার কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত রযমান মাসের বিস্তারিত মাসাইল সম্পর্কিত “রমযানের ফযিলত” নামক কিতাবের ১১৫-১৩৬ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। কিতাবটি নিজে কিনুন, অন্যকে উপহার দিন।
যারা মোবাইলে (পিডিএফ) কিতাবটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড করুন

দাওয়াতে ইসলামীর সকল বাংলা ইসলামীক বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুন

মাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন