কালিমা, নামায, রোযা, হজ্ব ও যাকাত নিয়ে ইসলামী জীবন

মাহে রমযান: ফযিলত ও বিধানাবলী (পর্ব ২)

295

রোযা কার উপর ফরয?

বাকী পর্ব পড়তে ক্লিক করুন- প্রথম পর্ব তৃতীয় পর্ব

তাওহীদ ও রিসালাতকে বিশ্বাস করা ও দ্বীনের সব জরুরী বিষয়ের উপর ঈমান আনার পর যেভাবে প্রত্যেক মুসলমানের উপর নামায ফরয বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে, অনুরূপভাবে রমযান শরীফের রোযাও প্রত্যেক মুসলমান (নর ও নারী) বিবেকসম্পন্ন ও প্রাপ্ত বয়স্কের উপর ফরয। ‘দুররে মুখতার’ এর মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, রোযা ২য় হিজরীর ১০ই শা’বানুল মুআয্যামে ফরয হয়েছে। (রদ্দুল মুহতার সম্বলিত দুররে মুখতার, খন্ড-৩য়, পৃ-৩৩০)

মাহে রমাদ্বান: ফযিলত ও বিধানাবলী

রোযা ফরয হবার কারণ

ইসলামে বেশিরভাগ কাজ কোন না কোন মহান ব্যক্তির ঘটনাকে জীবিত রাখার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। যেমন, সাফা ও মারওয়ার মধ্যখানে হাজীদের ‘সাঈ’ হযরত সায়্যিদাতুনা হাজেরা رضى الله عنها এর স্মৃতিময়ী। তিনি رضى الله عنها তাঁর কলিজার টুকরা হযরত সায়্যিদুনা ইসমাঈল যবীহুল্লাহ عليه السلام এর জন্য পানি তালাশ করতে গিয়ে এ দুটি পাহাড়ের মাঝখানে সাতবার প্রদক্ষিণ করেছেন ও দৌঁড়িয়েছেন। আল্লাহর নিকট হযরত সায়্যিদাতুনা হাজেরা رضى الله عنها এর এ কাজটা অত্যন্ত পছন্দ হয়েছে। তাই এই ‘সুন্নতে হাজেরা’ رضى الله عنها কে আল্লাহ তাআলা স্থায়ীত্ব দানের জন্য হাজীগণ ও ওমরা পালনকারীদের জন্য ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’র সাঈকে (প্রদক্ষিণ করাকে) ওয়াজিব করে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে, রমযানের দিনগুলোতে কিছুদিন, আমাদের প্রিয় আকা, মক্কা ও মদীনার তাজেদার হুযুর পুরনূর হযরত মুহাম্মদ হেরা পর্বতের গুহায় অতিবাহিত করেছিলেন। তখন হুযুর দিনের বেলায় পানাহার থেকে বিরত থাকতেন, আর রাতে আল্লাহ তাআলার যিকরে মশগুল থাকতেন। তাই আল্লাহ তাআলা ওই দিন গুলোর স্মরণকে তাজা করার জন্য রোযা ফরয করেছেন; যাতে তাঁর মাহবুব এর সুন্নতও স্থায়ী হয়ে যায়।

রোযা রাখলে কি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে?

সাধারণ লোকদের মধ্যে এ ধারণা পাওয়া যায় যে, রোযা রাখলে মানুষ নাকি দূর্বল হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে; অথচ এমন নয়। এ প্রসঙ্গে ইমামে আহলে সুন্নাত আলা হযরত মাওলানা শাহ আহমদ রেযা খান رحمة الله عليه এর ঈমান তাজাকারী ঘটনা পেশ করা হচ্ছে-সুতরাং ‘আল মালফুয, ২য় খন্ড, ১৭৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “এক বছর রমযানুল মুবারক থেকে কিছু পূর্বে মরহুম পিতা ইসলামী তর্কশাস্ত্রের প্রবীন ইমাম সায়্যিদুনা মাওলানা নকী আলী খান رحمة الله عليه স্বপ্নে তশরীফ আনলেন। আর বললেন, “পুত্র! আগামী রমযান শরীফে তুমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়বে, কিন্তু মনে রেখো! কোন রোযা যেনো কাযা না হয়ে যায়। সুতরাং পিতা মহোদয়ের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে বাস্তবিকই রমযানুল মুবারকে আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম, কিন্তু কোন রোযা ছুটেনি। রোযার বরকতে আল্রাহ আমাকে সুস্থতা দান করলেন। সুস্থতা পাবো না কেন? সায়্যিদুল মাহবুবীন এর ইরশাদ পাকও রয়েছে (অর্থাৎ তোমরা রোযা রাখো এবং সুস্থতা লাভ করো!) অর্থাৎ রোযা রাখলে সুস্থ হয়ে যাবে। (দুররে মনসুর, খন্ড-১ম)

রোযা রাখলে সুস্বাস্থ্য পাওয়া যায়

এ প্রসঙ্গে আমীরুল মু’মিনীন হযরত মওলায়ে কায়িনাত, আলী মুরতাজা, শেরে খোদা رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, “আল্লাহর প্রিয় রসূল, রসূলে মকবুল হযরত মুহাম্মদ এর সুস্থতা প্রদানকারী বাণী, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বনী ইস্রাইলের এক নবী عليه السلام এর নিকট ওহী প্রেরণ করলেন, “আপনি আপনার সম্প্রদায়কে খবর দিন, যে কোন বান্দা আমার সন্তুষ্টির জন্য এক দিনের রোযা রাখে, আমি তার শরীরকে সুস্থতা দান করবো, তাকে মহা প্রতিদানও দেবো।” (শুআবুল ঈমান, খন্ড-৩য়, পৃ-৪১২, হাদীস নং-৩৯২৩)

পূর্ববর্তী গুনাহের কাফফারা

হযরত সায়্যিদুনা আবূ সাঈদ খুদরী رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, আমাদের প্রিয় মাদানী আকা হযরত মুহাম্মদ ইরশাদ ফরমান, “যে ব্যক্তি রমযানের রোযা রেখেছে, সেটার সীমারেখা চিনেছে এবং যা থেকে বিরত থাকা চাই, তা থেকে বিরত থেকেছে, তবে সে (যেসব গুনাহ্) ইতোপূর্বে করেছে, সেগুলোর কাফফারা হয়ে গেল।”
(আল ইহসান বিতরতীবে সহীহ ইবনে হাব্বান, খন্ড-৫ম, পৃ-১৮৩, হাদীস-৩৪২৪)

রোযার প্রতিদান

হযরত সায়্যিদুনা আবূ হুরাইরা رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, সুলতানে মদীনা, সুরূরে কলবো সীনা হযরত মুহাম্মদ ﷺ ইরশাদ করেন, “মানুষের প্রতিটি সৎকর্মের বিনিময় (সাওয়াব) দশগুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত দান করা হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,  কিন্তু রোযা এর ব্যতিক্রম; অর্থাৎ- সেটা আমার জন্য। আমিই তার প্রতিদান দেবো। আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন, “বান্দা তার ইচ্ছা ও আহার শুধু আমারই কারণে ছেড়ে দেয়। রোযাদারের জন্য দুটি খুশী একটা ইফতারের সময়, অন্যটা আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাতের সময়। রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তাআলার নিকট মুশক অপেক্ষাও বেশি উত্তম।” (সহীহ মুসলিম, পৃ-৫৮০, হাদীস নং-১১৫১) আরো ইরশাদ ফরমায়েছেন, “রোযা হচ্ছে ঢাল। আর যখন কারো রোযার দিন আসে তখন সে না অনর্থক কথা বলে, না শোর-চিৎকার করে। অতঃপর যদি কেউ তাকে গালি গালাজ করে, কিংবা ঝগড়া-বিবাদ করতে উদ্যত হয়, তখন সে যেনো এ কথা বলে দেয়, “আমি রোযাদার।” (বোখারী, খন্ড-১ম, পৃ-৬২৪, হাদীস নং-১৮৯৪)

জান্নাতী দরজা

হযরত সায়্যিদুনা সাহল ইবনে আবদুল্লাহ رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, মাহে নুবুওয়াত হযরত মুহাম্মদ এর মহান বাণী, “নিশ্চয় জান্নাতে একটা দরজা আছে, যাকে ‘রাইয়ান” বলা হয়। এটা দিয়ে কিয়ামতের দিন রোযাদাররাই প্রবেশ করবে। তারা ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। বলা হবে, ‘রোযাদারগণ কোথায়?’ অতঃপর এসব লোক দাঁড়াবে। তারা ব্যতীত অন্য কেউ ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। যখন রোযাদাররা প্রবেশ করবে, তখন দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। তারপর ওই দরজা দিয়ে অন্য কেউ প্রবেশ করবে না।” (সহীহ বোখারী, খন্ড-১ম, পৃ-৬২৫, হাদীস নং-১৭৯৬)

একটা রোযার ফযীলত

হযরত সায়্যিদুনা সালমা ইবনে কায়সার رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, নবীগণের সারদার হযরত মুহাম্মদ এর খুশবুদার ফরমান, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একদিনের রোযা পালন করেছে, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে এতো দূরে রাখবেন যেমন একটা কাক, যা সেটার শৈশব থেকে উড়তে আরম্ভ করে, শেষ পর্যন্ত বুড়ো হয়ে মরে যায়।” (মুসনাদে আবী ইয়ালা, খন্ড-১ম, পৃ-৩৮৩, হাদীস নং-৯১৭)

লাল পদ্মরাগ মণির প্রাসাদ

আমীরুল মু’মিনীন হযরত সায়্যিদুনা উমর ফারুকে আযম رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, নবীয়ে করীম এর মহান বাণী, “যে ব্যক্তি মাহে রমযানের একটা মাত্র রোযাও নীরবতা এবং শান্তভাবে রেখেছে, তার জন্য জান্নাতে একটা ঘর লাল পদ্মরাগ-মণি কিংবা সবুজ পান্না দিয়ে তৈরী করা হবে।” (মাজমাউয যাওয়ায়িদ, খন্ড-৩য়, পৃ-৩৪৬, হাদীস নং-৪৭৯২)

শরীরের যাকাত

হযরত সায়্যিদুনা আবু হুরাইরা رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, হুযুরে পুরনূর হযরত মুহাম্মদ এর আনন্দদায়ক ফরমান, “প্রতিটি বস্তুর জন্য যাকাত রয়েছে, শরীরের যাকাত হচ্ছে রোযা। আর রোযা হচ্ছে ধৈর্যের অর্ধেক।” (ইবনে মাজাহ, খন্ড-২য়, পৃ-৩৪৭, হাদীস নং-১৭৪৫)

ঘুমানোও ইবাদত

হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আওফা رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, মাহবুবে রব্বে আকবর হযরত মুহাম্মদ এর নূরানী বাণী, “রোযাদারের ঘুমানো ইবাদত, তার নীরবতা হল তাসবীহ পাঠ করা, তার দু‘আ কবুল এবং তার আমল মকবুল।” (শুআবুল ঈমান, খন্ড-৩য়, পৃ-৪১৫, হাদীস নং-৩৯৩৮)
( রোযাদার কি পরিমাণ সৌভাগ্যবান! তার ঘুমানো ইবাদত, তার নীরবতা মানে তাসবীহ পাঠ করা, দু‘আ ও নেক কার্যাদি আল্লাহর দরবারে মকবুল।

জান্নাতী ফল

আমীরুল মু’মিনীন হযরত সায়্যিদুনা আলী মুরতাজা رضى الله عنه হতে বর্ণিত, রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ এর হৃদয়গ্রাহী বাণী, “যাকে রোযা পানাহার থেকে বিরত রেখেছে, যার প্রতি মনের আগ্রহ ছিলো, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতী ফলমূল আহার করাবেন আর জান্নাতী পানীয় পান করাবেন।” (শুআবুল ঈমান, খন্ড-৩য়, পৃ-৪১০, হাদীস নং-৩৯১৭)

স্বর্ণের দস্তরখানা

হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, মাহবূবে রব্বে দা’ওয়ার হযরত মুহাম্মদ এর পূর্ণ হৃদয়গ্রাহী বাণী, “কিয়ামতের দিন রোযাদারদের জন্য স্বর্ণের একটা দস্তরখানা রাখা হবে, অথচ লোকজন (হিসাব নিকাশের জন্য) অপেক্ষমান থাকবে।” (কানযুল উম্মাল, খন্ড-৮ম, পৃ-২১৪, হাদীস নং-২৩৬৪)

সাত প্রকারের আমল

হযরত সায়্যিদুনা আবদুল্লাহ ইবনে উমর رضى الله عنهم থেকে বর্ণিত, নবী করীম, রউফুর রহীম ইরশাদ করেন, “আল্লাহর নিকট ‘কাজসমূহ’ সাত প্রকার। দু’টি ওয়াজিবকারী, দু’টির প্রতিদান (সেগুলোর) মতোই, একটা আমলের প্রতিদান সেটার দশগুণ বেশি। একটা আমলের প্রতিদান সাতশত গুণ পর্যন্ত, আরেক আমলের প্রতিদান তেমন, যেটার সাওয়াব আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্য কেউ জানে না।”
যে দু’টি ‘আমল’ কাজ ওয়াজিবকারী। সে দু‘টি হচ্ছে: 
১. ওই ব্যক্তি, যে আল্লাহর সাথে এমতাবস্থায় সাক্ষাত করেছে যে, আল্লাহর ইবাদত নিষ্ঠার সাথে করেছে এবং কাউকে তাঁর সাথে শরীক করেননি, অতএব তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়েছে।
২. যে আল্লাহ তাআলার ইবাদত এমতাবস্থায় করেছে যে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক সাব্যস্ত করেছে। তার জন্য দোযখ ওয়াজিব হয়েছে।
২. আর যে ব্যক্তি একটা গুনাহ করেছে, সেটার সমসংখ্যক (অর্থাৎ একটি গুনাহের) শাস্তি পাবে।
৩. আর যে ব্যক্তি শুধু সৎকাজের ইচ্ছা করেছে, তাহলে একটা নেকীর সাওয়াব পাবে আর যে ব্যক্তি নেকীর কাজটি করে নিয়েছে, তাহলে সে দশ (নেকীর সাওয়াব) পাবে।
৬. তাছাড়া, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় আপন সম্পদ ব্যয় করেছে, তখন তার ব্যয়কৃত একটা মাত্র দিরহামকে সাতশ দিরহামে, এক দিনারকে সাতশ’ দিনারে বর্ধিত করা হবে।
৭. রোযা আল্লাহ তা;আলার জন্য। তা পালনকারীর সাওয়াব আল্লাহর নিকট। তা পালনকারীর সাওয়াব আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কেউ জানে না।”(কানযুল উম্মাল, খন্ড-৮ম, পৃ-২১১, হাদীস নং-২৩৬১৬)

হিসাব বিহীন প্রতিদান

হযরত সায়্যিদুনা কা’আবুল আহবার رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কিয়ামতের দিন একজন আহ্বানকারী এ বলে আহবান করবে, “প্রতিটি আমলকারী কে তার আমল এর সমান সাওয়াব দেয়া হবে, কুরআনের জ্ঞানে জ্ঞানীগণ ও রোযাদারগণ ব্যতীত। তাদেরকে সীমাহীন ও হিসাব ছাড়া সাওয়াব দান করা হবে।” (শুআবুল ঈমান, খন্ড-৩য়, পৃ-৪১৩, হাদীস নং-৩৯২৮)

জাহান্নাম থেকে দূরে

হযরত সায়্যিদুনা আবু সাঈদ খুদরী رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, নবীগণের সারদার হযরত মুহাম্মদ এর সুগন্ধি বিতরণকারী বাণী, “যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একদিন রোযা রাখবে, আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নাম থেকে সত্তর বছরের দূরত্বে রাখবেন।” (সহীহ বোখারী শরীফ, খন্ড-২য়, পৃ-২৬৫, হাদীস নং-২৮৪০)

একটা রোযা না রাখার ক্ষতি

হযরত সায়্যিদুনা আবূ হুরায়রা رضى الله عنه থেকে বর্ণিত, রসুলগণের সরদার হযরত মুহাম্মদ ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি রমযানের এক দিনের রোযা শরীয়তের অনুমতি ও রোগাক্রান্ত হওয়া ছাড়া ভেঙ্গেছে (অর্থাৎ রাখেনি) তাহলে, সমগ্র মহাকাল যাবৎ রোযা রাখলেও সেটার ‘কাযা’ সম্পন্ন হবে না। যদিও পরবর্তীতে রেখেও নেয়।” (সহীহ বোখারী, খন্ড-১ম, পৃ-৬৩৮, হাদীস নং-১৯৩৪) (অর্থাৎ ওই ফযীলত, যা রমযানুল মুবারকে রোযা রাখার বিনিময়ে নির্ধারিত ছিলো, এখন সেটা কোন মতেই পেতে পারে না। আমাদের কখনোই অলসতার শিকার হয়ে রমযানের রোযার মতো মহান নেয়ামত ছেড়ে দেয়া উচিত হবে না। যেসব লোক রোযা রেখে কোন বিশুদ্ধ বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ভঙ্গ করে বসে, তারা যেনো আল্লাহর কহর ও গযবকে ভয় করে। 

উপুড় করে লটকানো মানুষ

হযরত সায়্যিদুনা আবু উমামা বাহেলী رضى الله عنه বলেন, আমি সারকারে মদীনা হযরত মুহাম্মদ কে এ কথা ইরশাদ করতে শুনেছি, “আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন স্বপ্নে দুজন লোক আমার নিকট আসলো। আর আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ের উপর নিয়ে গেলো। আমি যখন পাহাড়ের মাঝামাঝি পৌঁছলাম, তখন শুনতে পেলাম খুব ভয়ঙ্কর আওয়াজ আসছে।” আমি বললাম, “এ কেমন আওয়াজ?” তখন আমাকে বলা হলো, “এটা জাহান্নামীদের আওয়াজ।” তারপর আমাকে আরো সামনে নিয়ে যাওয়া হলো। তখন আমি এমন কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, যাদেরকে তাদের পায়ের রগদ্বারা গোড়ালীতে বেঁধে উপুড় করে লটকানো হয়েছে, আর ওইসব লোকের চিবুকগুলো চিরে ফেলা হয়েছে। ফলে সেগুলো থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিলো। তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম-এসব কারা? তদুত্তরে, আমাকে বলা হলো, “এসব লোক রোযা ভঙ্গ করতো-এরই পূর্বে যখন রোযার ইফতার করা হালাল।” (অর্থাৎ ইফতারের পূর্বে রোযা ভঙ্গ করে ফেলত) (সহীহ ইবনে হাব্বান, খন্ড-৯ম, পৃ-২৮৬, হাদীস-৭৪৪৮)

তিনজন হতভাগা

হযরত সায়্যিদুনা জাবির ইবনে আবদুল্লাহ رضى الله عنهم থেকে বর্ণিত, তাজেদারে মদীনা হযরত মুহাম্মদ এর মহান ইরশাদ হচ্ছে, “যে ব্যক্তি রমযান মাস পেয়েছে এবং সেটার রোযা রাখেনি, সেই ব্যক্তি হতভাগা। যে ব্যক্তি আপন মাতাপিতাকে কিংবা উভয়ের একজনকে পেয়েছে কিন্তু তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করেনি, সেও হতভাগা, আর যার নিকট আমার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু সে আমার উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করেনি, সেও হতভাগা।” (মাজমাউয যাওয়ায়িদ, খন্ড-৩য়, পৃ-৩৪০, হাদীস নং-৪৭৭৩)

নাক মাটিতে মিশে যাক

হযরত সায়্যিদুনা আবু হুরায়রা رضى الله عنه থেকে বণিত, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, “ওই ব্যক্তির নাক ধুলায় মলিন হোক, যার নিকট আমার নাম নেয়া হয়েছে, কিন্তু সে আমার উপর দুরূদ পড়েনি এবং ওই ব্যক্তির নাক ধুলায় মলিন হোক, যে রমযানের মাস পেয়েছে, তারপর তার মাগফিরাত হওয়ার পূর্বে সেটা অতিবাহিত হয়ে গেছে। আর ওই ব্যক্তির নাক ধুলোয় মলিন হোক, যার নিকট তার পিতামাতা বার্ধক্যে পৌঁছেছে এবং তার পিতামাতা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করায়নি। (অর্থাৎ বুড়ো মাতাপিতার খিদমত করে জান্নাত অর্জন করতে পারেনি।) (মুসনাদে আহমদ, খন্ড-৩য়, পৃ-৬৯, হাদীস নং-৭৪৫৫)

রোযার তিনটা স্তর রয়েছে

রোযার জন্য প্রকাশ্য পূর্বশর্ত যদিও এটাই যে, রোযাদার ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকবে, তবুও রোযার জন্য কিছু অভ্যন্তরীন নিয়মাবলীও রয়েছে। যেগুলো জানা জরুরী, যাতে প্রকৃত অর্থে আমরা রোযার বরকতসমূহ লাভ করতে পারি। যেমন ১.সাধারণ লোকদের রোযা, ২. বিশেষ লোকদের রোযা এবং ৩. বিশেষতম লোকদের রোযা।

১. সাধারণ লোকদের রোযা- ‘সওম’ বা রোযার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বিরত থাকা। সুতরাং শরীয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকাকে রোযা বলে। এটাই হচ্ছে সাধারণ মানুষের রোযা।
২. বিশেষ লোকদের রোযা- পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার সাথে সাথে শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা হচ্ছে বিশেষ লোকদের রোযা।

৩. বিশেষতম লোকদের রোযা- নিজেদেরকে সমস্ত বিষয় থেকে বিরত রেখে শুধুমাত্র আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা। এটাই হচ্ছে বিশেষতম লোকদের রোযা।
প্রয়োজন হচ্ছে-পানাহার ইত্যাদি থেকে “বিরত থাকার” সাথে সাথে নিজের শরীরের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গকেও রোযার আওতাভুক্ত করা।

হযরত দাতা رحمة الله عليه এর বাণী

হযরত সায়্যিদুনা দাতা গঞ্জে বখশ আলী হাজবেরী رحمة الله عليه বলেন, রোযার বাস্তবতা হচ্ছে: ‘বিরত থাকা’। আর বিরত থাকারও অনেক পূর্বশর্ত রয়েছে। যেমন: পাকস্থলীকে পানাহার থেকে বিরত রাখা, চোখকে প্রবৃত্তির দৃষ্টি থেকে বিরত রাখা, কানকে গীবত শোনা থেকে, জিহ্বাকে অনর্থক কথাবার্তা ও ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী কথাবার্তা বলা থেকে এবং শরীরকে আল্লাহ তাআলার নির্দেশের বিরোধিতা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে রোযা। যখন বান্দা এসব পূর্বশর্তের অনুসরণ করবে, তখনই সে প্রকৃতপক্ষে রোযাদার হবে। (কাশফুল মাহজুব, পৃ-৩৫৩, ৩৫৮)

আল্লাহ তাআলার কিছুর প্রয়োজন নেই

হযরত মুহাম্মদ এর আলীশান ফরমান, “যে ব্যক্তি খারাপ কথা বলা ও তদনুযায়ী কাজ কর্ম পরিহার করবে না, তার ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকার কোন প্রয়োজন আল্লাহর কাছে নেই।” (সহীহ বোখারী, খন্ড-১ম, পৃ-৬২৮, হাদীস নং-১৯০৩) অন্য এক স্থানে ইরশাদ করেছেন, “শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম রোযা নয়, বরং রোযা হচ্ছে, অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে বিরত থাকা।” (হাকিম কৃত মুস্তাদরাক, খন্ড-২য়, পৃ-৬৭, হাদীস নং-১৬১১)

আমি রোযাদার

রোযাদারের উচিত হচ্ছে: সে রোযা পালনকালে যেখানে পানাহার ছেড়ে দেয়, সেখানে মিথ্যা, ধোঁকা, প্রতারণা, ঝগড়া-বিবাদ ও গালি-গালাজ, ইত্যাদির গুনাহও ছেড়ে দেবে। এক জায়গায় হুযুর ইরশাদ করেছেন, “তোমাদের সাথে যদি কেউ ঝগড়া করে গালি দেয়, তবে তোমরা তাকে বলে দাও, “আমি রোযাদার।” (আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব, খন্ড-১ম, পৃ-৮৭, হাদীস নং-১)

রোযার ইফতার তোকে দিয়েই করবো!

আজকাল তো মামলাই উল্টা নজরে পড়ছে বরং এখনতো বাস্তবিক অবস্থা এমন হয়ে গেছে যে, যখন কেউ কারো সাথে ঝগড়া করে বসে, তখন গর্জে ওঠে এমনি বলে ফেলে, “চুপ হয়ে যা! নতুবা মনে রাখিশ! আমি রোযাদার। আর এ রোযার ইফতার তোকে দিয়েই করবো।” অর্থাৎ তোকে খেয়ে ফেলবো। আল্লাহর পানাহ! তওবা!! তওবা!!! এ ধরণের কথা কখনো মুখ থেকে বের না হওয়া চাই; বরং বিনয়ই প্রকাশ করা চাই। এসব বিপদ থেকে আমরা শুধু তখনই বাঁচতে পারবো, যখন নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নিয়মিতভাবে রোযা পালনের চেষ্টা করাবো।

অঙ্গ প্রত্যঙ্গের রোযার সংজ্ঞা

এখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোযা অর্থাৎ দেহের সমস্ত অঙ্গকে গুনাহ্থে কে রক্ষা করা’ এটা শুধু রোযার জন্য নির্দিষ্ট নয়, বরং গোটা জীবনই ওইসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ্ থেকে বিরত রাখা জরুরী। আর এটা তখনই সম্ভব, যখন আমাদের অন্তরগুলোতে আল্লাহর ভয় পাকাপোক্ত হয়ে যাবে। আহ! কিয়ামতের ওই বেহুঁশকারী দৃশ্য স্মরণ করুন, যখন চতুর্দিকে নফসী নফসী’ এর অবস্থা হবে, সূর্য-আগুন বর্ষণ করবে, জিহ্বাগুলো পিপাসার তীব্রতার কারণে মুখ থেকে বের হয়ে পড়বে, স্ত্রী স্বামী থেকে, মা তার কলিজার টুকরা সন্তান থেকে, পিতা আপন পুত্র, আপন চোখের মণি থেকে পালাবে, অপরাধী-পাপীদেরকে ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে, তাদের মুখের উপর মোহর চেপে দেয়া হবে এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের গুনাহসমুহের তালিকা শুনাতে থাকবে, যা কুরআন পাকের সূরা ‘ইয়াসীন’-এ এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে
কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: আজ আমি তাদের মুখগুলোর উপর মোহর করে দেবো। আর তাদের হাতগুলো আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পাগুলো তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। (পারা-২৩, ইয়াসিন, আয়াত-৬৫)
হায়! দূর্বল ও অক্ষম মানুষ! কিয়ামতের ওই কঠিন সময় সম্পর্কে নিজের হৃদয়কে সতর্ক করুন। সর্বদা নিজের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টায় অব্যাহত রাখুন।

লিখাটি আমীরে আহলে সুন্নাত হযরত মাওলানা ইলয়াস আত্তার কাদেরী রযভী কর্তৃক লিখিত রযমান মাসের বিস্তারিত মাসাইল সম্পর্কিত “রমযানের ফযিলত” নামক কিতাবের ৬৮-৯৬ নং পৃষ্ঠা হতে সংগৃহীত। কিতাবটি নিজে কিনুন, অন্যকে উপহার দিন।

যারা মোবাইলে (পিডিএফ) কিতাবটি পড়তে চান তারা ফ্রি ডাউনলোড দিন

দাওয়াতে ইসলামীর সকল বাংলা ইসলামীক বইয়ের লিংক এক সাথে পেতে এখানে ক্লিক করুন

বাকী পর্ব পড়তে ক্লিক করুন- প্রথম পর্ব তৃতীয় পর্ব
মাদানী চ্যানেল দেখতে থাকুন